ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা পূরণ হবে?

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা পূরণ হবে?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত সপ্তাহজুড়ে নানা ধরনের ঘটনা নির্বাচনী আলাপে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমান দেশে ফিরে এসেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে তাঁকে ঘিরে আগের মতোই বন্দনাও শুরু হয়েছে। চমক ঠিক বলা যাবে না, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ থেকে নিজ দল ছেড়ে অনেক শীর্ষ নেতাও বিএনপিতে যুক্ত হচ্ছেন। দুইজন খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধা যোগ দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীতে। কিংস পার্টির তকমা পাওয়া এনসিপি জোট করেছে জামায়াতের সঙ্গে। এনসিপির জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়া দলের অনেকেই যেমন মেনে নিতে পারেননি, তেমনি আহত হয়েছেন এনসিপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা অনেকে। সামাজিক মাধ্যমে আহা-উহু করছেন অনেকেই। এনসিপির পরিচিতি পাওয়া নারী নেত্রীদের কয়েকজন দল থেকে বের হয়েছেন এবং আবার কেউ কেউ নির্বাচনকালীন দলের জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এনসিপি এর আগে ১২৫টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এখন এনসিপি থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শগত জোট নয়, এটি নির্বাচনী জোট। তারা আরও যুক্তি দিয়েছেন যে, এনসিপি আগে একক দল হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলেও শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড তাদের নতুন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে এবার অনেকেই নির্বাচন করছেন না। ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে। পাহাড়ের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতিও নির্বাচনে থাকছে না। ব্যক্তিগতভাবে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলমও নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন। 

মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দলের কার্যক্রম নিষদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। যদিও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ এবং লুটপাট, নিপীড়নসহ নানাবিধ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন করতে পারছে জামায়াতে ইসলামী। সামাজিক মাধ্যমে এগুলো নিয়ে নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক চলছে। প্রশ্ন উঠেছে এই অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও, যে প্রশ্ন বেশ আগেই বিএনপি তুলেছিল। তবে যে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট কিংবা খুব বেশি আশাজাগানিয়া নয়, সেটি হলো এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটারদের উচ্ছ্বাস এবং তাদের আলোচনা ও অংশগ্রহণ। অনেকেই এখনও নিশ্চিত নয় যে, নির্বাচন হবে। আর হলে সেই নির্বাচন কী আবারও আগের মতোই নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে? 

যারা মনে করেন নির্বাচন নির্ধারিত তারিখেই হবে, তাদের বক্তব্য–নির্বাচন না হলে তারেক রহমান দেশে ফিরতেন না। তবে উপদেষ্টাদের অনেকেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সম্মানজনক ‘নিষ্ক্রমণ’ খুঁজছেন বলে অনেকেই মনে করেন। তাই সরকারও এখন নির্বাচনমুখী। যদিও এক বছর আগেও এদের অনেকেই নির্বাচনের কথা শুনলেই খেপে যেতেন। তখন মূল কথা ছিল ‘সংস্কার’। এখনই সেই ‘সংস্কার’ কেমন করে যেন অনেক দূরের হয়ে গেছে। 

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এখনও যে প্রশ্নগুলো নির্বাচন নিয়ে সংশয় পাকাপোক্ত করেছে সেগুলোর মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে সরকার আসলে একটি সফল নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য সামর্থ্যবান কিনা। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি যে, সরকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জায়গা হলো প্রার্থীদের অস্ত্রের লাইসেন্স এবং বেশ কয়েকজন গানম্যান দেওয়া। এই দুইয়ের মাধ্যমেই কি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে? কিন্তু জনগণের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে সেই বিষয়ে এখনও পরিষ্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা মোকাবিলা এবং নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোট প্রদানের কৌশল কী হবে সেই বিষয়ে সরকার আদৌ কিছু ভাবছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টা যতটা ‘গণভোট’-এর ওপর জোর দিয়েছেন, ভোটারদের নিরাপত্তা, নিরাপদে ভোট প্রদানের পরিবেশ–এসব আলাপে তিনি ততটাই কম ঢুকছেন।  
ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ হিসেবে নির্বাচন খুব কাছেই। সে অনুপাতে এখনও নির্বাচনী আমেজ নেই। এর কারণ হতে পারে নির্বাচন নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এদিকে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি দিয়েছেন পাঁচজন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য। নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এই চিঠিতে আরও বলেছেন, এতে ভোটারদের একটি বড় অংশ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কারণ বলাই হচ্ছে যে, ভোটারদের একটা বড় অংশ (যা প্রায় ৩৫%) আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাই এগুলো নিয়েও নানা ধরনের গুঞ্জন, গুজব চলমান রয়েছে। এবং সেগুলো অক্সিজেন দেয় ‘যেনতেন’ ভোটের আশঙ্কাটিকে। ওদিকে ওসমান হাদির  হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন না করার দাবি তুলেছিল ইনকিলাব মঞ্চ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা তাদের শাহবাগের অবস্থান তুলে নিলেও, আবারও তারা সেখানে বসবেন না তা বলা যায় না। সরকার যদিও বলেছে, তাদের আমলেই নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে, সেটি কতটুকু রক্ষিত হবে তা বলা কঠিন।

শুধু নির্বাচনী জোটই  নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো চুপেচাপে আসন ভাগাভাগি করতে পারে, এ গুঞ্জন যেমন আছে তেমনি এর কিছু কিছু গোপনও থাকছে না। বৃহস্পতিবার জামায়াতের আমির তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছেন, আগের মতোই তারা একসঙ্গে কাজ করবেন। নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে তারা আবারও একসঙ্গে বসবেন, সেটাও তিনি বলেছেন। (সমকাল অনলাইন) তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের যে আশা গত এক দশক ধরে মানুষ করছে, তাও ফিকে হয়ে যেতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে দেশ ও জাতি আবারও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, হলফ করেই তা বলা যায়।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×