ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ও জ্বালানি নিরাপত্তা

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপ ও জ্বালানি নিরাপত্তা
×

এইচ এম সাব্বির হোসেইন

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪:৫৪

ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তার হঠাৎ করে ঘটেনি। এটি ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক সংঘাতেরই পরিণতি। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মাদুরো কখনোই বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান নন, বরং তিনি একটি অপরাধমূলক শাসনের নেতা। গত বছরের জুলাইয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে মাদুরো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নন এবং তাঁর সরকারের কোনো আইনি বৈধতা নেই। রুবিও মাদুরোর বিরুদ্ধে কার্টেল দে লোস সোলেস নামক একটি মাদক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ তোলেন, যা নাকি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তিনি এটিও স্মরণ করিয়ে দেন যে মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত।

ওয়াশিংটনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, এই হামলা ও গ্রেপ্তারকে শাসন পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে আইনি ভাষা কেবল যুক্তি দেয়, পুরো চিত্র ব্যাখ্যা করে না। প্রকৃত কারণ নিহিত রয়েছে ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে।
ভেনেজুয়েলার হাতে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুত। অর্থনীতি ধসে পড়া এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও এই সম্পদ দেশটিকে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ বা নির্ণায়ক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি যখন ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্পদের ওপর তার প্রভাব বাড়বে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ইরান সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের ওপর। তেহরানের সঙ্গে যেকোনো সংঘাতে ওয়াশিংটনের একটি বড় দুর্বলতা হলো পারস্য উপসাগরে সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা, যেখানে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এই ঝুঁকি কমাতে পারে। ভারী অপরিশোধিত তেলের একটি বিকল্প উৎস যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের আওতায় থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতজনিত বৈশ্বিক সরবরাহ ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে। এতে উত্তেজনা বাড়ানোর অর্থনৈতিক খরচ কমবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সহজ হবে।

জ্বালানি প্রশ্নটি আর্থিক শক্তির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বৈশ্বিক তেল বাণিজ্য এখনও মূলত মার্কিন ডলারে পরিচালিত হয়, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ডলারের কেন্দ্রীয় অবস্থানকে শক্তিশালী করে। প্রধান তেল উৎপাদকদের ওপর প্রভাব বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে, যা তার অর্থনৈতিক আধিপত্যের ভিত্তি। এই অর্থে ভেনেজুয়েলা কেবল তেল উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভিত্তি রক্ষার প্রশ্ন।

চীন বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বোঝে। গত দুই দশকে বেইজিং ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, ঋণ, অবকাঠামো প্রকল্প এবং রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রবেশাধিকারের বিনিময়ে। চীনের কাছে ভেনেজুয়েলা একদিকে জ্বালানি অংশীদার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের সফল হস্তক্ষেপ লাতিন আমেরিকায় চীনের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করবে এবং দেখিয়ে দেবে যে কঠোর শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষে চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতিরও সীমা আছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সতর্ক এবং বিভক্ত। অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্র মাদুরোর শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেছে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে তারা অস্বস্তিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সংযোগের মধ্যে ইউরোপ আটকে আছে। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্য ও বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতি ইউরোপ অত্যন্ত সংবেদনশীল, ফলে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতির পরিণতি ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

লাতিন আমেরিকার ভেতরে এই পরিস্থিতি গভীর রাজনৈতিক বিভাজনকে উন্মোচিত করেছে। কিছু সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও অপরাধমূলক প্রশাসনের অবসান ঘটানোর জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে। অন্যরা একে সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্নকারী হস্তক্ষেপমূলক রাজনীতির বিপজ্জনক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের অতীত হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা এই বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলেছে। ফলে ভেনেজুয়েলা হয়ে উঠেছে একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে নির্ধারিত হচ্ছে লাতিন আমেরিকা নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজে গড়তে পারবে কিনা, নাকি বাইরের শক্তির দ্বারা তা নির্ধারিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত সাফল্য পায়, তবে ভেনেজুয়েলা একটি কৌশলগত দৃষ্টান্তে পরিণত হবে। এটি দেখাবে যে অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক একঘরে করা এবং সামরিক শক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রগুলোর কাঠামো নতুন করে সাজানো সম্ভব। এই বার্তা অঞ্চল ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের হিসাবকে প্রভাবিত করবে।

তবে ব্যর্থতার ঝুঁকিও কম নয়। দীর্ঘস্থায়ী সংকট বা স্থায়ী প্রতিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মনোযোগ ও সম্পদ ক্ষয় করবে। এতে অন্যত্র শক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা দুর্বল হবে এবং ইসরায়েলসহ ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কৌশলগত পরিকল্পনা জটিল হয়ে উঠবে। বিভ্রান্ত ও ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাহস জোগায় এবং বিকল্প শক্তিকেন্দ্রের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে।

ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, তা ভেনেজুয়েলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিকে রূপ দেবে, মার্কিন ক্ষমতার সীমা নতুন করে নির্ধারণ করবে এবং ভবিষ্যৎ হস্তক্ষেপগুলো কীভাবে মূল্যায়িত হবে, তা প্রভাবিত করবে। কারাকাস তেহরান, বেইজিং বা ব্রাসেলস থেকে দূরে মনে হতে পারে, কিন্তু এই সংকটের অভিঘাত তাদের সবার কাছেই পৌঁছাবে।

শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা কেবল মাদুরোকে ঘিরে নয়। এটি তেল, কৌশলগত প্রভাব এবং ক্রমশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক বিশ্বে বৈশ্বিক ক্ষমতার দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন।
 

আরও পড়ুন

×