ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

নির্বাচনে প্রার্থিতার পথে অহেতুক কাঁটা

নির্বাচনে প্রার্থিতার পথে অহেতুক কাঁটা
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ সদস্যপদের প্রার্থিতা নিয়ে সংবিধানে যে যোগ্যতার বর্ণনা আছে, তা বড়ই সরল। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(১) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে এবং তাঁর বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সংসদের প্রার্থী হওয়ার যোগ্য। তবে তিনি অযোগ্য হতে পারেন কোনো উপযুক্ত আদালত তাঁকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা দিলে; দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করে থাকলে; বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে এবং নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত এবং মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকলে। 

সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদমূলে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করলে যেখানে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য, সেখানে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলেই কি প্রার্থিতা জায়েজ হয়? রদ হয়ে যায় ভিন রাষ্ট্রের প্রতি ঘোষিত আনুগত্য, প্রেম? একবার বিয়ে করার পর সেই বৈবাহিক সম্পর্ক ত্যাগ করলেই যেমন কৌমার্য দাবি করা যায় না, তেমনি একবার কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করার পর তা ত্যাগ করলেই নিজ দেশের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য হয় না। সুযোগ পেলেই তিনি আবার কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবেন না– তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবুও আমরা সহজ-সরল মানুষ মেনে নিয়েছি ভিন দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলেই নিখাদ বাংলাদেশি থাকা যায়। মিথ্যে হয়ে যান কবি জসীম উদ্‌দীন এবং তাঁর সোজন বাদিয়ার ঘাট-এর ‘মন সে-ত নহে কুমড়ার ফালি, যাহারে তাহারে কাটিয়া বিলান যায়’ বচনটি। আমাদের নির্বাচনী তরিকায় মন একাধিক ঠাঁইয়ে বিলান যায় আবার চাইলে ফিরিয়েও আনা যায়।

সংবিধানের সীমা ছাড়িয়ে ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি’র মতো হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, যা আরপিও নামে সমধিক পরিচিত। এতে জুড়ে দেওয়া হলো অনেক কিছু এবং বেশির ভাগই এক-এগারোর আমলে। আগে জাতীয় সংসদ সদস্যপদে প্রার্থিতার জন্য প্রার্থীর ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। নির্বাসিত কেউ যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, সেই উছিলায় জোড়া হলো প্রার্থীর ভোটার হওয়ার বাধ্যবাধকতা। আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিধান জোড়া হয়েছে তা হলো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রার্থিতা দাখিলের সময় ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন-সংবলিত স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা যুক্ত করার হুকুম। 
এক-এগারোয় বিধান জোড়া হলো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রার্থিতা দাখিলের সময় দলের মনোনয়ন পেয়েছেন– মর্মে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারীর স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র যুক্ত করতে হবে। প্রাথমিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিতে পারবে। যাচাই-বাছাই-আপিল ইত্যাদি শেষ হওয়ার পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন বা তার আগে রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী দলের একজন প্রার্থীকে চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন দেবেন। যাদের অনুকূলে তারা কোনো পত্র দেবেন না তাদের মনোনয়ন স্থগিত হয়ে যাবে। ফলে সংগত কারণে তারা কোনো প্রতীক পাবেন না।

কিন্তু এমনও তো হতে পারে, কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী যাতে নির্বাচন করতে না পারেন সে উদ্দেশ্যে তাঁকে প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হলো না। তিনি হয়তো আগে তা আঁচ করতে পারলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতেন। আবার যদি ধরেও নেওয়া হয়, স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে সম্মতি দিতে ভোটাররা হুমড়ি খেয়ে সারিবদ্ধ হয়ে নাম তালিকাভুক্ত করছেন, তাহলেও প্রতি নাম যাচাই-বাছাই করে লিপিবদ্ধ করতে কমপক্ষে ৩ মিনিট সময় লাগতে পারে। গড়পড়তায় চার হাজার ভোটারের জন্য ১২০০০ মিনিট বা ২০০ ঘণ্টা লাগবে। দিনে ১০ ঘণ্টা এই কাজে ব্যয়িত হলেও মোট কর্মদিবস ২০। একজন দলছুট প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে স্বতন্ত্র প্রার্থিতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে ২০ কর্মদিবস সময় বের করা খুবই কষ্টসাধ্য।
নির্বাচনের মুখ্য উদ্দেশ্য ধরে নেওয়া যায় উপযুক্ত প্রার্থীদের ভেতর থেকে ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা। প্রার্থিতা দাখিলের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ফলে কি ভোটারের প্রার্থী বাছাইয়ের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় না? 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে; যার মধ্যে ৩৩৮টিই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের অন্যতম কারণ দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাইকৃত ১০ জন সমর্থকের এক বা একাধিক সমর্থকের সম্মতির সত্যতা নেই জানতে পারা। সম্ভবত রাজনৈতিক দলও চায় খেলার মাঠ সংকুচিত হোক। অথচ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশের চাপ না থাকলে তা হতো সকল প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এ থেকে আখেরে ভোটাররাই ফায়দা পেতেন। শক্তিশালী হতো গণতন্ত্র।
বিদ্যমান আরপিও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের স্বার্থের অনুকূলে। তাই তো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন বহাল রাখতে হলে ন্যূনতম কতটি আসনে প্রার্থী দিতে হবে বা কত শতাংশ ভোট পেতে হবে, তার কোনো বিধান রাখা হয়নি। অথচ টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রতীক প্রচার করতে পারবেন যুগ যুগ ধরে। অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর হাতে প্রতীক প্রচারের সময় মাত্র তিন সপ্তাহ। এই বৈষম্য দূর হোক। ভোটারদের প্রার্থী বাছাইয়ের সুযোগ আরও প্রসারিত হোক। নির্বাচন কমিশনের নীতিতে শত ফুলের বিকাশ ঘটুক।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×