তথ্য প্রযুক্তি
কর্মসংস্থানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা
ইমতিয়াজ মির্জা
প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ১০:২২
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে এআইর মাধ্যমে প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এটা এমন এক বিশাল অঙ্ক, যা পুরো বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রই বদলে দিতে পারে। বাংলাদেশও এই বিপুল সম্ভাবনার বাইরে নয়। আমাদের সামনেও সুযোগ আছে এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশীদার হওয়ার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই প্রস্তুত? এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইলে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, দূরদর্শী নীতি এবং সবচেয়ে বড় কথা– আমাদের তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা বাড়ানো।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের জন্য এআই একটা সুবর্ণ সুযোগ। কারণ, এআই শুধু একটা সাধারণ টুল বা সফটওয়্যার নয়– এটা একটা বিশাল অর্থনৈতিক বিপ্লব। যারা এই প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে, আগামী দিনে তারাই বিশ্বে নেতৃত্ব দেবে। শিক্ষা খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এআইর মাধ্যমে শিক্ষাকে অনেক বেশি সহজলভ্য আর মানসম্মত করা সম্ভব। গ্রামের যেসব এলাকায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই, সেখানে এআইর সাহায্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া যায়। কৃষিতে এর ব্যবহার উৎপাদন বাড়াতে পারে বহুগুণ। ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধিতেও এর জুড়ি নেই। কিন্তু এসব সুবিধা পেতে হলে দরকার সুচিন্তিত পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এআইর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা– সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তারা প্রযুক্তির নতুন যুগে দেশকে নেতৃত্বের আসনে বসাতে পারে। এআই শিক্ষা সফল করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও টেক কোম্পানির মধ্যে সুনির্দিষ্ট লিখিত চুক্তি দরকার, যেখানে প্রশিক্ষণ, কাজের ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট থাকবে। শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্রেডিটের বিনিময়ে সরাসরি কোম্পানিতে বাস্তব প্রজেক্টে কাজের সুযোগ দিতে হবে, যা তাদের দক্ষ করবে এবং এআই খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এআই ডিসরাপশনকে সঠিক পথে চালিত করতে হলে এখনই একটা শক্তিশালী ‘জাতীয় এআই টাস্কফোর্স’ গঠন করা দরকার। বেসরকারি খাত বা টেক কোম্পানিগুলো আনবে তাদের গতিশীলতা, বিনিয়োগ আর বাজারের বাস্তব অভিজ্ঞতা, যা গবেষণার ফলাফলকে মানুষের কাজে লাগানো পণ্যে রূপ দেবে।
আর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে এই পুরো ব্যবস্থার হার্ট, যারা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা মাথায় রেখে দক্ষ জনবল তৈরি করবে আর মৌলিক গবেষণায় নেতৃত্ব দেবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে হবে না– এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারবে বাংলাদেশকে এআই খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে। টাস্কফোর্সের হাত ধরে একটা সুস্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যেখানে আগামী পাঁচ বছরে আমরা ঠিক কোথায় পৌঁছাতে চাইছি তার পুরো ছক থাকবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা আশাবাদী যে, বাংলাদেশে এআই-ভিত্তিক অনেক নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি হবে। টেক ইন্ডাস্ট্রিতে এখনই এআই ডেভেলপার, মেশিন লার্নিং ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট এসব পদের চাহিদা বাড়ছে। কৃষি খাতে এআই দিয়ে ফসলের রোগ শনাক্ত করা, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করা আর উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নতুন ধরনের বিশেষজ্ঞ লাগবে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে গ্রামীণ এলাকায় টেলিমেডিসিন আর রোগ নির্ণয়ে এআই ব্যবহার করে নতুন সেবা চালু হবে, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। শিক্ষা খাতে পার্সোনালাইজড লার্নিং প্ল্যাটফর্ম আর অনলাইন কোর্স ডিজাইনের ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ বাড়বে।
তবে সবকিছুর মাঝে কিছু সতর্কবার্তাও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইর কারণে ধনী-দরিদ্রের ফারাক বাড়ার একটা বড় ঝুঁকি রয়েছে। এই ডিজিটাল বৈষম্য এড়াতে হলে এআই শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য করতে হবে। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি খাত– সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে যেন এই প্রযুক্তি শুধু শহর বা ধনীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
শিক্ষাবিদরা আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন– রি-স্কিলিং বা নতুন করে দক্ষতা অর্জন। পুরোনো কর্মীদের জন্য রি-স্কিলিং কর্মসূচি চালু করতে হবে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে যাদের চাকরি ঝুঁকিতে পড়বে, তাদের নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগ দিতে হবে যেন তারা নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
এআই বাংলাদেশের জন্য ভয়ের কিছু নয়, বরং একটা বিশাল সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। আমাদের তরুণরা মেধাবী আর পরিশ্রমী। তারা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায় আর এআইয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ‘টেক হাব’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ফলে কোটি কোটি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে আর দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। তবে সেজন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ আর সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা আজ থেকেই নিজেদের প্রস্তুত করছে।
ইমতিয়াজ মির্জা: সফট ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট
- বিষয় :
- তথ্যপ্রযুক্তি
