সমকালীন প্রসঙ্গ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে কাদের আসা উচিত
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের লক্ষ্যে সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী বাছাই কমিটি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি। বিশেষ করে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কমিশনের সকল সদস্যের পদত্যাগ এবং দীর্ঘ সময় কমিশন কার্যত অকার্যকর অবস্থায় থাকার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগ নতুন করে প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়নের পর ২০১০ সালে প্রথম কমিশন গঠিত হয়। শুরু থেকেই মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আইনটির বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের সরাসরি তদন্তের এখতিয়ার না থাকা কমিশনের কার্যকারিতাকে সীমিত করে রেখেছিল। অথচ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বাস্তবতায় বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা– এসব অভিযোগের বড় অংশই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে।
এ সীমাবদ্ধতার ফলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কখনোই জনগণের কাছে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেনি। উপরন্তু বিগত কমিশনগুলো গঠনে দেখা গেছে, প্রধানত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা থেকে আসা ব্যক্তিরাই নেতৃত্বে ছিলেন। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও একাডেমিক যোগ্যতা প্রশ্নাতীত হলেও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কিংবা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভুক্তভোগীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার নজির ছিল না বললেই চলে।
মানবাধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, কমিশন অনেক সময় সরকারের আনুগত্যে পরিচালিত হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন বা গুমের মতো গুরুতর অভিযোগে কমিশনের নীরবতা কিংবা অত্যন্ত দুর্বল প্রতিক্রিয়া সেই অভিযোগকে আরও শক্তিশালী করেছে। একটি কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের মধ্যে নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘অস্বস্তিকর প্রশ্ন’ তুলবে– এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন কমিশন সেই ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন নাগরিকদের ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে ব্যাপক সংযোজন ও বিয়োজন করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কমিশনের সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। শুধু আইন সংশোধন করলেই কমিশন কার্যকর হয়ে উঠবে– এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ নিহিত কে বা কারা কমিশনে নিয়োগ পাচ্ছেন–এই প্রশ্নে।
কমিশনের সদস্য হিসেবে কাদের নিয়োগ করা হবে? দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা নাগরিকদের, নাকি আবারও সরকারের আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের? অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ সরকারি আমলাদের সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অবসরে এসে তাদের মধ্যে কয়জন মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন? কয়জন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন?
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যার মূল লক্ষ্য নাগরিকদের সুরক্ষা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে মানবাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, চুক্তি ও কনভেনশন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নৈতিক সাহস, স্বাধীন মানসিকতা এবং রাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করার সক্ষমতা।
তবে আমাদের এখানে নাগরিক সমাজের মধ্যে সাহস ও নৈতিকতার সঙ্গে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করেন বা করছেন এ রকম লোকের সংখ্যা খুব বেশি বলা যায় না। এর মধ্যে এমনও দেখা যায়, কেউ কেউ মাঠের কাজের চেয়ে গণমাধ্যমে সরব থেকে নিজেকে মানবাধিকারকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মানবাধিকার প্রশ্নে নিয়মিত গণমাধ্যমে বিবৃতি বা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় থাকা একমাত্র যোগ্যতার মানদণ্ড হতে পারে না। কমিশনের সদস্য নির্বাচনে তাই গভীর যাচাই-বাছাই অত্যাবশ্যক। কে সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন; কার গবেষণা, প্রকাশনা, মামলা সহায়তা, আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ কিংবা ভুক্তভোগীদের পক্ষে দাঁড়ানোর রেকর্ড রয়েছে, সে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
একজন নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা করি, এবারের কমিশন গঠনে যদি সত্যিকার মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, মাঠ পর্যায়ের কর্মী, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের তরুণ ও অভিজ্ঞ প্রতিনিধিদের অগ্রাধিকার দেওয়া না হয়, তাহলে কমিশন আবারও একটি আনুষ্ঠানিক ও নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এটি কেবল অতীতের মতো একটি কমিশনের ব্যর্থতা হবে না; বরং রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং মানবাধিকারকর্মীদের প্রতি আস্থা দেখানো জরুরি। এ সুযোগ যদি আমরা এবারও হারাই তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায় তৈরি হবে নিঃসন্দেহে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
