ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভাষার মাস

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন

মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা সচেতন
×

আকমল হোসেন

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম। সামাজিক জীব হিসেবে মানুষের বিভিন্নমুখী চাহিদা মেটানোর জন্য যেমন অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, তেমনি অন্যের সঙ্গে যোগাযোগেরও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানান প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটলেও ভাষার গুরুত্ব কমেনি। ভাষার নানাবিধ চর্চা তাকে বিকশিত করে, সমৃদ্ধ করে এবং মানুষের কাছে গ্রহণীয় করে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম এমন অনেক ভাষারই বিলুপ্তি ঘটেছে। সংখ্যার বিচারে বাংলার অবস্থান ৪ নম্বরে, তবে সংখ্যার বিচারে বিবেচনা করা উচিত হবে না, যদি না সেই ভাষাভাষীর শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনবোধে বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় 
দাঁড়াতে না পারে। 

বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জীবন দিয়েছেন সালাম-বরকত-শফিক-রফিক-জব্বার। সে সময় শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার স্থাপনে বাধা দেওয়া হলো, তাদের অনুসারীরা স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ওই শহীদ মিনার ভেঙে দিয়েছে, মাঝেমধ্যে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়া শরিয়তে জায়েজ কী জায়েজ নয়, সেই ফতোয়া দিতে দেখা যায়। 
ভারতের আসামের শীলচরে ১৯৬১ সালে বাংলা ভাষা রক্ষার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে সেখানেও ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভারতের আসামে তখন ক্ষমতাসীন ছিল ভারতীয় কংগ্রেস। শাসক ও সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের স্বার্থে অন্য জাতি ও সম্প্রদায়ের ওপর ভাষা ও সংস্কৃতিগত আগ্রাসন চালিয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেলেও ব্যবহারিক দিকে তার দৈন্যদশা কাটেনি, দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। ভাষার সংগ্রামের প্রেরণায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শোষণ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর ধর্মীয় নিষ্পেষণের জাঁতাকল থেকে বাঙালি মুক্তির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে। মানুষের জীবন দান এবং মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মাধ্যমে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা; বাঙালির পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। 

এর পরও বাংলা ব্যবহারিক জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। চিকিৎসা বিজ্ঞান, গবেষণা, ব্যাংক হিসাব খোলার আট পাতা এবং ঋণ গ্রহণের জন্য ২৭ পাতার ইংরেজি ফরমের ফিরিস্তি এখনও বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসে আছে। দেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, বিশ্বায়নের জোয়ার বইছে কিন্তু অনুবাদ শিল্প এগোয়নি, এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু বাংলার অবস্থান কমছে। পারিবারিক অনুষ্ঠান বিয়ে-খতনার দাওয়াতপত্রও লেখা হচ্ছে অন্য ভাষায়। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ লুটপাটের মাধ্যমে কিছু মানুষের হাতে কাঁচা টাকা আসায় কি ছিনু আর কি হনু–এই অহমিকায় বাংলা ছেড়েছে তারা, পোশাক-আশাকে বাংলা সংস্কৃতির অনুপস্থিতি দিনদিন বাড়ছে। বাংলা শেখার আগেই ইংরেজির পেছনে ঘুরছে, ছেলেমেয়েদেরও ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার আয়োজন চলছে। নিজে যেটি করতে পারেনি, সন্তানদের দ্বারা সেটি করার সর্বশেষ চেষ্টা চলছে। উঠতি বয়সের একশ্রেণির মানুষ বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণ ঘটিয়ে কী যে বলছে–যেটি না হচ্ছে বাংলা না হচ্ছে ইংরেজি, যেটি হাল-ফ্যাশনের উলঙ্গবাহার পোশাকের মতো। এসবের ফল যে কী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজিতে মিনিমাম পাস নম্বরও না পাওয়ার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভাষা ছেড়ে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে পড়েনি।

১৯৫২ সালে জাতিসংঘের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের শাসক ১২ বছরব্যাপী সবার জন্য এলিমেন্টারি শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলেও ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষা চালুর বিধান করেছে। শাসকদের জনবিমুখ রাজনৈতিক নীতি জাতির জন্য নানান দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের বিপক্ষে পরিচালিত হলে জনতার কিছুই করার থাকে না। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য, সেটা থেকে রক্ষা পাওয়া জনগণের জন্য খুবই কঠিন কাজ। পাকিস্তানি শাসন অস্ত্রের মাধ্যমে বাংলা ভাষার যত না ক্ষতি করতে পেরেছে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে চলেছে এ আমলের অপ্রকাশ্য শত্রুরা। কথায় বলে কোমরের ছুরিতে কোমর কাটে, বাইরের শত্রু থেকে রক্ষা পেলেও ঘরের শত্রু থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। এ যেন ঘরের শত্রু বিভীষণ। মা মাটি মাতৃভাষা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেটা অনুধাবন করে বিশ্বায়নের সঙ্গে টিকে থাকতে বাংলা ভাষাকে বিকশিত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও দেশপ্রেম।

আকমল হোসেন: কলেজ অধ্যক্ষ; 
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

আরও পড়ুন

×