ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে ভোটাররা উৎসবমুখর হবেন কীভাবে?

নিরাপত্তা শঙ্কার মধ্যে ভোটাররা উৎসবমুখর হবেন কীভাবে?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খুব কাছাকাছি এসেও যে প্রশ্ন জনপরিসরে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো, ভোটাররা কি আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে ভোট দিতে যাবেন? এটি নিয়ে যখন ভাবছিলাম তখনই নজরে পড়ল, বেসরকারি সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের (বিইপিওএস) যৌথভাবে করা একটি জরিপের ফল বলছে, ‘৯০ শতাংশের বেশি ভোটার জানিয়েছেন যে তারা ভোট দিতে চান’ (সমকাল, ৪ ফেব্রুয়ারি)। যদিও বিশেষত বাংলাদেশ এবং এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায় নির্বাচনকেন্দ্রিক জরিপের ফল খুব একটা গুরুত্ব পেতে কমই দেখা যায়, জরিপটি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। এগুলো কারা কাদের অর্থায়নে করছে, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় এবং জরিপের প্রশ্নমালা কী ছিল ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রশ্নের সদুত্তর ছাড়া সংবাদমাধ্যমে এসব জরিপের ব্যাপক প্রচার কাম্য নয়। কারণ এর মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা থাকে। 

বাংলাদেশের সব ভোটার একই পাটাতনে বসবাস করেন না। অবশ্যই নির্বাচনী মাঠে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা এবং এর সঙ্গে আরও যুক্ত আছে ধর্ম, জাতি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা। কারণ বিশেষ অবস্থা তৈরি করে কখনও কোনো জাতি, সম্প্রদায়কে ভোটদানে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভোটাররা ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য ভোট দিতে বাধ্য হন। তাই ওই জরিপের ভিত্তিতে বলা যায় না যে ৯০ শতাংশ ভোটার এবার ভোট দিতে যাবেন।

আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ে ঘটা চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ঘটনাগুলো আমলে নিই তাহলে দেখতে পাব হিন্দু ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত পল্লিতে এক সপ্তাহে সাতটি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পাড়ার বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশেষ কোনো মহল আতঙ্ক ছড়িয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখার জন্যই এ ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে ৫০ দিনে চট্টগ্রামের রাউজানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২টি ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এমনকি ঘরের ভেতরে মানুষ রেখে দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটেছে (সমকাল ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)। নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনার অবশ্যই রাজনৈতিক চরিত্র আছে এবং তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। 

বিষয়টি এমন নয় যে এর আগে নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা অনেকখানিই বেড়েছে। ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য সরকারিভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সংঘটিত হয়েছে। আর বাকি সব সাধারণ অপরাধ বলে মনে করছে সরকার (প্রথম আলো, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)। তবে বাকিগুলোর পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে বলে মনে করে, তাই এগুলো সরকারের কাছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে গণ্য হয়নি। প্রশ্ন হলো, কোনো কারণ দেখিয়ে কি আসলে কোনো ধরনের সহিংসতার বৈধতা দেওয়া যায়? যে কারণেই হোক সহিংসতা ঘটলে সেটির বিচার তো হতে হবে। সেটি কি করছে সরকার? আর রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে সহিংসতা করলেই বা সেটি সাধারণ অপরাধ কেন হবে? ট্যাগ দিয়ে কেউ মব কিংবা সহিংসতা করলে সেটির কোনো বিচার হবে না?

গত ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবিসি নিউজ বাংলার এক প্রতিবেদনে যশোরের অভয়নগরের নির্মল বিশ্বাসকে বলতে দেখা গেছে, ‘আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাবো আমরা কন?’ এটি হয়তো অনেকেরই মনের কথা। সবাই বলতে পারছে না। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে হিন্দুদের সবসময়ই আওয়ামী লীগের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হয়। যে কারণে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যে নির্বাচনের আগে এবং পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা বড় হয়ে পড়ে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নিপীড়নের স্মৃতি আবারও আতঙ্ক হয়ে ফিরে আসছে হিন্দুদের কাছে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্বাচন করতে পারছে না। তাই নৌকার সমর্থক মুসলমানরাও নিরাপদ নন। সবাই সন্দেহের চোখে দেখছে, তাদের ভোট কোন দিকে যায়। আবার ভয়ে যদি কেউ ভোটকেন্দ্রে না যান তাহলেও রক্ষা নেই। তখন আরও বড় বিপদ। ফ্যাসিবাদের ‘দোসর’ ট্যাগ দিয়ে আক্রমণ করা হবে। ভোট নিয়ে এ রকম ভয়াবহ চাপের মধ্যে আছে তাই অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ মানুষ। তাই জরিপের মতো করে ৯০ শতাংশ ভোটার খুব আগ্রহ নিয়ে ভোটদানের অপেক্ষায় আছেন, সেটি আসলেই বলা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। 

কাছাকাছি চাপে আছেন আরও অনেকেই। পছন্দমতো প্রার্থী নেই, তাই হয়তো ভোট দেবেন না বলে ঠিক করেছেন অনেক সাধারণ মানুষ। এর আগের অনেক নির্বাচনেও একই কারণে ভোট দেননি। কিন্তু এবার ভয় পাচ্ছেন। কারণ মনে করছেন এবার ভোটকেন্দ্রে না গেলে ‘দোসর’ বলে পরবর্তী সময়ে হামলার শিকার হতে পারেন। 

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচনটি নাগরিক অধিকার প্রয়োগের জায়গা থেকে সরে গিয়ে এখন চাপ, অস্বস্তি, ভয়, আতঙ্কের জায়গা হয়ে উঠেছে–এমনটা বললে হয়তো ভুল হবে না। কারণ এই শঙ্কা, আতঙ্ক ও অনিরাপত্তার বিষয়টি শুধু নির্বাচনের দিন ঘিরে নয়, নির্বাচনের পরের দিনগুলোতেও থাকবে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যতই ভারী অস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে পাহারায় থাকার প্রতিশ্রুতি দিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়, বিশেষ করে মব সহিংসতা রোধে তাদের গত ১৮ মাসের রেকর্ড কোনো ভরসা জোগায় না।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 [email protected]
 

আরও পড়ুন

×