ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

নির্বাচনকালীন নাগরিক নিরাপত্তা

নির্বাচনকালীন নাগরিক নিরাপত্তা
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন মানেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আগামী ১২ তারিখ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বহু প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো নিরাপত্তা। নির্বাচনকালীন নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কতটা প্রস্তুত? নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই এই প্রশ্ন আমাদের উদ্বেগের প্রধান বিষয় হয়ে সামনে আসছে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নির্বাচনী কেন্দ্রের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নজরদারির কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, আদতে সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট প্রস্তুত কি?
আমরা দেখেছি, তপশিল ঘোষণার মাত্র এক দিন পরই ওসমান হাদিকে দিনদুপুরে গুলি করে খুন করা হয়। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোনো কোনো দলের নেতাকর্মীর বাসাবাড়িতে অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে।  বিএনপির কর্মীদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংঘাতও দৃশ্যমান। 

এ কারণে মনে হয়, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল বাড়ালেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সেই আস্থা তৈরি হয়নি; বরং দিন দিন রাজনৈতিক বৈরিতা বেড়েছে।

অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচনকালীন সহিংসতা অনেক সময় ঘটে শেষ মুহূর্তে বা ভোটের দিন ও পরবর্তী সময়ে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখলের চেষ্টা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন– এসব চিত্র নতুন নয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে, সরকার কি কেবল দৃশ্যমান শক্তির ওপর নির্ভর করছে, নাকি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কৌশলগত প্রস্তুতিও যথেষ্ট?
নাগরিক নিরাপত্তা মানে শুধু ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়া নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার প্রয়োগের নিশ্চয়তা এবং ভোট শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরার পরিবেশ। বিশেষ করে নারী ভোটার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে অতীতে নানা অভিযোগ উঠেছে, যেগুলো আমলে না নিলে প্রস্তুতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ থেকেই যাবে।
সরকারের প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনের নিরপেক্ষতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলে জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়, তবে যত প্রস্তুতিই থাকুক না কেন, আস্থার সংকট তৈরি হবে। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন ডিজিটাল নিরাপত্তাও এখন নতুন বাস্তবতা। গুজব, ভুয়া খবর ও উস্কানিমূলক বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে। এ বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, সেটিও দেখার বিষয়। কেবল নজরদারি নয়, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল যোগাযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকার যে প্রস্তুতির কথা বলছে, তা কাগজ-কলমে যথেষ্ট মনে হলেও বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। নির্বাচন একটি দিনের ঘটনা হলেও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুরু হয় নির্বাচনের আগে; শেষ হয় অনেক পরে। সহিংসতা রোধে কঠোরতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা– এই তিনটি স্তম্ভের ওপরেই নির্ভর করবে এবারের নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে।
শেষ পর্যন্ত নাগরিকরা শুধু ঘোষণা নয়, বাস্তব নিরাপত্তা দেখতে চান। তারা চান ভয়হীনভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে, নিজের ভোট দিতে এবং নিরাপদে ঘরে ফিরতে। সরকার যদি সত্যিই এই মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন গণতন্ত্রের পথে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

আরও পড়ুন

×