ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জীবন-জীবিকা

নির্বাচনী ডামাডোলে ‘ওএমএস’ লাইনে মানুষের মুখ

নির্বাচনী ডামাডোলে ‘ওএমএস’ লাইনে মানুষের মুখ
×

রানা ভিক্ষু

রানা ভিক্ষু

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়েই ঘনিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতিশ্রুতি, আশ্বাস আর প্রতিপক্ষের দোষ-ত্রুটির বাহাসে গমগম করছে গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের বাতাস। ব্যানার-ফেস্টুন, মাইক আর স্লোগানে একদিকে যেমন উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে আতঙ্কের নাগরদোলাও দোলাচ্ছে অনেককে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশের চিরচেনা অনেক দৃশ্য– বিশেষ করে পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানের তর্ক-বিতর্ক আগের মতো জমে ওঠেনি। জনগণের একটি বড় অংশ ভার্চুয়াল জগতে নানা পক্ষের বাক্যযুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় হয়তো নির্বাচনী তর্ক-বিতর্ক চায়ের দোকান পর্যন্ত গড়ায়নি। তবে নির্বাচনী জনসভাগুলোতে মানুষের উপস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশিই দেখা যাচ্ছে। স্লোগানমুখর জনতার হইচইয়ে অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে নেতাদের বক্তব্য। 

নির্বাচনী জনসভায় অংশগ্রহণের কারণ যাই হোক, আশা করি এই জনসমাগমকে শক্তিশালী গণতন্ত্রের দৃশ্যমান সূচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে সহজে। তবে নির্বাচনী ঝড়ের দাপটে চাপা পড়া মেহনতি মানুষের দীর্ঘশ্বাস ইতিহাসকে দায়মুক্ত করবে না কখনও।

বলছি ওএমএস (খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি) লাইনে দাঁড়ানো দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী কিংবা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীদের কথা। ২০২৬ সালের প্রথম দিন থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ওএমএস (ট্রাকে বিক্রি) কার্যক্রমের ওপর পরিচালিত একটি জরিপ মতে, গ্রাম-গঞ্জ ও শহরের ওএমএস (ট্রাকে বিক্রি) লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগ হিসেবে ‘বরিশাল’-এর ৪টি জেলা; দরিদ্র জেলা হিসেবে ‘মাদারীপুর’ জেলার ২টি এবং দরিদ্র উপজেলা হিসেবে ‘ডাসার’ উপজেলার ১টি (মোট ৭টি) ওএমএস (ট্রাকে বিক্রি) পয়েন্টের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, পণ্য নিতে আসা লাইনের দৈর্ঘ্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর ৮টি (উত্তর সিটির ৪টি ও দক্ষিণ সিটির ৪টি) বিক্রয় পয়েন্টে ওএমএস (ট্রাকে বিক্রি) লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। জরিপে তথ্য সংগ্রহকারীরা বলছেন, ওএমএস লাইনে দাঁড়ানো মানুষের মলিন মুখগুলো নির্বাচনী জনসভার উচ্ছ্বসিত জনতার চেয়ে অনেক বেশি চাঞ্চল্যকর ও দৃষ্টি আকর্ষক। 

ওএমএসের নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ট্রাক বা দোকান চালু থাকার কথা। বাস্তবে ওএমএসের ট্রাকগুলো দুপুরের মধ্যেই বিক্রি শেষ করে ফিরে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র মানুষ অন্তত এক ঘণ্টা আগেই লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। তবুও খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। অপেক্ষমাণ মানুষের লাইন শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিনের বরাদ্দ পাওয়া ডিলারদের ওএমএস পণ্য। আর পণ্য পাওয়া-না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় আগেভাগে লাইনে দাঁড়াতে মানুষের প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, নীরবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওএমএস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে নির্বাচনী উন্মাদনা মনে হচ্ছে অর্থহীন; যেন দলবাজ জনতার রাজনৈতিক বিলাসিতা! 

জরিপ বলছে, ওএমএস লাইনে নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। তাদের পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা উপার্জনের তাগিদে ভোরেই কাজের সন্ধানে বেরিয়ে যান। লাইনে দাঁড়ানো মানুষের মধ্যে ১৭ শতাংশ আসেন খালি পেটে। অর্থাৎ সকালের নাশতা না করেই। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার কারণে ৩২.৮ শতাংশ মানুষ ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাটিতে বসে বিশ্রাম নেন। অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির মধ্যেই তাদের সময় কাটে। জরিপকালে নির্বাচনী শোভাযাত্রায় আটকে পড়া ওএমএস লাইনের এক নারীকে ক্লান্ত ও বিরক্ত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘ঢঙে বাঁচি না’!

মৌসুম থাকা সত্ত্বেও সবজির বাজারদর ওএমএস লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ‘মাথায় বেল ভাঙার’ মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। প্রতিদিনের উপার্জনে প্রতিদিনের খরচ মেটানো দিনমজুর অথবা মাসের মাঝামাঝি হিসাব ভেঙে পড়া নিম্ন বেতনভোগী মানুষ টিকে থাকার ন্যূনতম লড়াইয়েই ব্যস্ত। চাল-ডাল-তেলের মতো ওএমএসের মাধ্যমে সবজি বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার আকুতি জানান জরিপে তথ্যদাতাদের অনেকেই। তাদের কাছে ভোট বা নির্বাচনের চেয়ে প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

ডিলারদের ভাষ্য অনুসারে, সম্প্রতি লাইনে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ যে পরিমাণ পণ্য তোলা হতো, এখনও প্রায় একই পরিমাণ তোলা হচ্ছে। অথচ ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে অনেক। আগে অনেক সময় পণ্য অবিক্রীত থাকত। এখন দুপুরের আগেই সব শেষ হয়ে যায়। তা ছাড়া তারা চাইলে বাড়তি পণ্য তুলতে পারেন না, যদিও এর নেপথ্যের কারণ তারা বলতে অনিচ্ছুক। বাস্তবে এই ফাঁকফোকরেই ওএমএস লাইনের মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন তীব্র হয়ে ওঠে, নির্বাচনী মাঠভরা জনতার উল্লাস এবং ওএমএস লাইনে দাঁড়ানো মানুষের নীরব দীর্ঘশ্বাস কি একই সমাজের দুই মুখ? নাকি একে অপরের প্রতি উদাসীন দুটি ভিন্ন বাস্তবতা?
একদিকে নির্বাচনী প্রচারণার জৌলুস, অন্যদিকে মেহনতি মানুষের খাদ্যের অনিশ্চয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়– গণতন্ত্রের সূচক যত জাঁকজমকপূর্ণই হোক না কেন, জীবনের হিসাব বড়ই কঠিন! ওএমএস লাইনের মানুষ ভোটের মাঠের পরিবর্তে রান্নাঘরের চুলার দিকে তাকিয়ে খুঁজছেন গণতন্ত্র আর বৈষম্যহীনতার আসল মানে কী?

রানা ভিক্ষু: লেখক, গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×