ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রশাসন

বিভাগ গঠন যেন ‘ইজ্জত কা সওয়াল’

বিভাগ গঠন যেন ‘ইজ্জত কা সওয়াল’
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ‘বিভাগ চাই’ দাবি কম ছিল না। ভোটপ্রার্থীরাও যথাসাধ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচন যখন শেষ হয়েছে, তখন বিভাগ গঠনের ইতিহাস ও প্রেক্ষিতের দিকে ফিরে দেখা যাক।
খুলনা তখন সবে সিটি করপোরেশন হয়েছে। শহরে বদলে গেছে পুলিশি ব্যবস্থাপনা। জেলা পুলিশের নিয়ন্ত্রণ থেকে শহর চলে গেল মেট্রোপলিটন পুলিশের হাতে। শহরের আইনশৃঙ্খলার দায় বর্তাল টিআই বা টাউন ইন্সপেক্টরের বদলে পুলিশ কমিশনারের ওপর। পদক্রমে ইন্সপেক্টরের ওপরে যথাক্রমে এএসপি, অ্যাডিশনাল এসপি ও এসপি। এসপি জেলার প্রধান পুলিশ কর্তা। সেখানে পুলিশের কমিশনার হলেন ডিআইজি পদমর্যাদাসম্পন্ন, যিনি মূলত বিভাগীয় পুলিশপ্রধান। তিনিই হলেন শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান কর্তা। তো সে সময়ে জেলা উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির এক সভায় আলোচনা হচ্ছিল বাসের ছাদে যাত্রী বহন আটকানো নিয়ে। ছাদে যাত্রী বহন ঠেকাতে সড়কে বাঁশকল বসানোর প্রস্তাব উঠল। ছাদে যাত্রীবাহী বাস আটকে যাবে বাঁশে। প্রায় সবাই সোৎসাহে  সমর্থন দিলেন। তখনই মুখ খুললেন পুলিশ সুপার। তিনি বললেন, পাবলিককে আর বাঁশ দিয়েন না। ২৮ পুলিশের শহরে এখন আড়াই হাজার পুলিশ। তারপরও দিতে হবে বাঁশ? 

এরপর খুলনা বিভাগ ভেঙে বরিশাল বিভাগ হলো; গঠিত হলো বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং অবধারিতভাবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ। বারবার কানে বাজছিল খুলনার সেই এসপির বাঁশ-বিষয়ক কথন। তখন ধরেই নেওয়া হয়েছিল, বিভাগ হলে বিভাগীয় শহরের মান বাড়বে; পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশন হবে; লাগবে মেট্রোপলিটন পুলিশ। যেন একটার সঙ্গে আরেকটা অবিচ্ছেদ্য। 

একই ঘটনা ঘটল সিলেটে; ঘটল রংপুরে। হঠাৎ তালভঙ্গ ময়মনসিংহে। বিভাগ হলো ২০১৫ সালে; শহর সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলো, কিন্তু মেট্রোপলিটন পুলিশ এখনও প্রস্তাবিত। অন্যদিকে বিভাগীয় শহর না হলেও গাজীপুর আর নারায়ণগঞ্জ শহর দুটি সিটি করপোরেশন। গাজীপুরে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। নারায়ণগঞ্জ ২০১১ সালে, গাজীপুরের আগে করপোরেশন হলেও অপেক্ষায় আছে মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের। ফলে সূত্র আর মেলে না। বিভাগীয় শহর না হলেও সিটি করপোরেশন হতে পারে। সিটি করপোরেশন হলেই যে মেট্রোপলিটন পুলিশ হবে, তেমন কোনো কথা নেই। 
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসনভার দখল করে নবাবি ধারার শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। মূলত রাজস্ব আদায়ের তাগিদেই স্থাপিত হয় আধুনিককালের জেলা প্রশাসন। রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি জেলা হয়ে ওঠে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। ক্রমান্বয়ে মাঠ প্রশাসন, সামাজিক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ এহেন নানা কাজের জন্য জেলা হয়ে ওঠে সরকারের মাঠ পর্যায়ের মূল তালাচাবি। জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ৫০ বছরেরও বেশি সময় জেলা প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। বাংলা বিহার উড়িষ্যা তখনও সরাসরি গভর্নর জেনারেলের অধীনে। 

গভর্নর জেনারেলের কাজের ভার কমাতে ১৮২৯ সালে জেলা ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে তৈরি হলো আরেকটি স্তর– বিভাগ। আমাদের আজকের বাংলাদেশের সীমানায় ছিল তিনটি বিভাগ– ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। ১৮২৯ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ১১৮ বছরে তৎকালীন বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার নতুন কোনো বিভাগ গঠন করেনি। অনেকেরই জানা আছে, তৎকালীন খুলনা জেলা ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের ১৭ তারিখে পাকিস্তানভুক্ত হয়। একই দিনে মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা পাকিস্তান থেকে ছুটে ভারতে যুক্ত হয়। ছুটে যাওয়া খুলনাকে পাকিস্তানভুক্ত করতে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা খান আব্দুস সবুর খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি আইয়ুব খানের শাসনামলে হয়ে ওঠেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। নিজের শহরের মান বাড়াতে প্রেসিডেন্সি বিভাগ থেকে আসা আড়াই জেলা ও বরিশাল জেলা নিয়ে নতুন বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নিলে ১৯৬০ সালে খুলনা বিভাগ গঠিত হয়। প্রশাসনিক কারণে যতটা না, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাব প্রদর্শনের তাগিদেই খুলনা বিভাগ হয়।
প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের পর থেকে প্রায় ২০০ বছরে বিভাগ কখনোই জনসম্পৃক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান হয়নি। থানা বা উপজেলা, বিলুপ্ত মহকুমা ও জেলা প্রশাসন সরাসরি জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিভাগীয় প্রশাসন মূলত অধিক্ষেত্রে কর্মরত কর্মচারীদের তদারকি প্রতিষ্ঠান। আবার এমন কোনো নীতিও নেই যে, বিভাগ হলে সেখানে কী কী থাকবে-না থাকবে। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৮৪ সালে দেশের প্রায় সব মহকুমা জেলা হয়ে গেলেও বিভাগ চারটিই থেকে যায়। একদা শক্তিধর মানুষটি প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনলেও বিভাগ প্রতিষ্ঠায় ছিলেন না আগ্রহী। 

ক্রমান্বয়ে বরিশাল ও সিলেটে অতি ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উত্থান হওয়ায় তাদের আগ্রহে বরিশাল ও সিলেট বিভাগ হয়। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে ফরিদপুর আর কুমিল্লা বিভাগ গঠনের আওয়াজ উঠলেও দুই শহরের তেমন ভারিক্কি কেউ রাজনৈতিকভাবে শীর্ষে না থাকায় আওয়াজটি আলোর মুখ দেখেনি। বরং ঢুকে গেছে গণভোটের বিষয় হয়ে জুলাই সনদে। অন্যদিকে, পদ্মা সেতুর কল্যাণে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর হওয়ায় শরীয়তপুর ও মাদারীপুর ফরিদপুর বিভাগে না গিয়ে ঢাকার সঙ্গেই থাকতে চাচ্ছে। বৃহত্তর নোয়াখালীবাসীরও জোর দাবি– কুমিল্লা বিভাগভুক্ত না করে নোয়াখালীকে পৃথক বিভাগ করা হোক। এমনকি টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলা নিজেদের হয় ঢাকা বিভাগে রাখার, নয় তাদেরকেই বিভাগে উন্নীত করার দাবি জারি রেখেছে। একটি অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক স্তর গঠন, তাতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া-না হওয়া বিভিন্ন স্থানের মানুষজনের ‘ইজ্জত কা সওয়াল’ হয়ে উঠেছে।

আমাদের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বিধান থাকলেও স্বাধীনতার পর এই দীর্ঘ সময়ে বিভাগীয় স্তরে আইনানুগভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ওপর কখনোই স্থানীয় শাসনের ভার ন্যস্ত হয়নি কিংবা সে প্রচেষ্টাও শুরু হয়নি। তদুপরি ইউনিয়ন বা পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা স্তরের পরে বিভাগীয় স্তরে স্থানীয় শাসন অতিশয় বোঝা বৈ অন্য কিছু নয়। বিভাগীয় শহর না হলেও কোনো শহর সিটি করপোরেশন হতে পারে; তাতে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হলেও বিভাগীয় শহর হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। 

প্রশাসনিক স্তর নিয়ে ইতোপূর্বে লেখালেখি করেছেন এমন কেউই বিভাগীয় স্তরের পক্ষে কোনো সাফাই গাননি। প্রত্যেকেই স্তরটি অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন। আধুনিক যুগে দেশে বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় উপায়েই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। সরকার সহজেই দ্রুততার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে জেলা পর্যায়ের পদাধিকারীদের সঙ্গে। মাঝে একটি বিভাগীয় স্তর থাকলে তা এই যোগাযোগকে বিলম্বিত করে। এমনকি সচেতন নাগরিকরাও জেলা স্তরের পরে বিভাগীয় স্তরকে একটি বাড়তি বোঝা ঠাহর করে। তাই জনগণের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন একটি অপ্রয়োজনীয় স্তর হিসেবে বিবেচিত প্রশাসনিক বিভাগ স্তরটি বিলুপ্ত করা হোক। তাতে কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের ব্যয় সংকোচন হবে।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক, অবসরপ্রাপ্ত 
অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×