ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সুশাসন

ভোটের পরে ভোটের আশা

ভোটের পরে ভোটের আশা
×

মানজুর-আল-মতিন

মানজুর-আল-মতিন

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছবিটার কথা মনে আছে? রাস্তার লাগোয়া তিন-চারটা সিঁড়ি। তারপর একটু সমতল জায়গা পেরিয়ে একটা কাচের দরজা। সে দরজার পেছনে আর দশটা দিনের মতোই বসে আছেন গাঢ় নীল ইউনিফর্ম পরা সিকিউরিটি গার্ড, কাচের দরজার দিকে পাশ ফিরে। তাঁর দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ, স্থির। খুব সাধারণ দৃশ্যপট হতে পারত। কিন্তু সে দৃশ্য মোটেও সাধারণ নয়। একবার ছবিটি দেখলে সারাজীবন ছবিটি আপনাকে তাড়া করে ফিরবে। কারণ সে সিঁড়ির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন এক যুবক, অনন্তকাল ধরে যেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সিঁড়ি। তার পেছনে নিরাপত্তারক্ষীর নির্লিপ্ততা যেন অনন্ত। 

জুলাই ২০২৪। এমনি আরও অজস্র ছবির অন্তহীন ভান্ডার। যেসব স্মৃতি অনেক সময় খুব বেশি বাস্তব হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। বিপুল বেদনার ঢেউ ওঠে হৃদয়ের গহিনতম তন্ত্রীতে। 
আজ ’২৬-এর দখিনা বাতাস দরজায় কড়া নাড়ছে। যে নির্বাচন আদৌ হবে কিনা– সংশয় জানিয়েছিলেন অনেকে; সে নির্বাচন হয়েই গেল শেষ পর্যন্ত। রাত ২টার দিকে যখন কে সরকার গঠন করবে তা মোটামুটি নিশ্চিত, তখন আমার মনে পড়ছিল জুলাইয়ে জীবন বিলিয়ে দেওয়া মানুষদের কথা। 

একটা নির্বাচনই তো! উৎসবের মেজাজে মানুষ যাবে ভোট দিতে। ঠিক করে দেবে পরের পাঁচ বছর কে চালাবে দেশ। এই তো ব্যাপার! ভাবছিলাম, এই অতি সাধারণ অধিকারটুকু আদায় করতে এত মানুষকে জীবন দিতে হলো! 

একটা ভালো নির্বাচন হলে এবং সে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসে আরেকটা ভালো নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়ার চাপ থাকলে কী হয়, তা এবারের নির্বাচন ঘিরে দেখা গেল বেশ। যেসব রাজনীতিবিদ এই সেদিন বিরোধী মতের মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জপ করেছেন দিনরাত, তারাই নির্বাচনের আগে ভোল পাল্টে সবার জন্য সমাজে জায়গা করে দেওয়ার কথা বলেছেন। নির্বাচনের পরে বিজয়ী প্রার্থীরা ছুটে গেছেন পরাজিত প্রার্থীর বাসায়। একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন সবাই। যারা পরাজিত হয়েছেন, তারাও ভোট বর্জন করে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছেন না এখনও। কারণ সবার মাথাতেই আছে, অদূর ভবিষ্যতে আরেকবার জনগণের সামনে যেতে হবে। তখন নতুন-পুরোনো সব কথারই জবাব দিতে হবে।

সামাজিক মাধ্যম এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ভালো-মন্দ দুই বিচারেই। একদিকে প্রচুর ভুল তথ্য সামনে এসেছে; এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে মিথ্যা ভিডিও। অন্যদিকে প্রার্থীদের পুরোনো আর নতুন বক্তব্য পাশাপাশি দেখানোর সুযোগ থাকায় নেতাদের ভন্ডামিও সামনে এসেছে। উগ্র মতবাদগুলো অনেক সময় সামাজিক মাধ্যম দাপিয়ে বেড়ালেও দিনের শেষে প্রমাণ হয়েছে– দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উগ্রতা আর ঘৃণার রাজনীতি পছন্দ করে না। 

আমি বিশ্বাস করতে চাই, এর পরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বিঘ্নে হবে। সরকার তাদের কাজ দিয়ে নির্বাচনে জিতে আসার চেষ্টা করবে; ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নয়। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই রাজনীতি করবে। একটা গন্ডগোল বাধিয়ে, রাজপথ গরম করে সরকার ফেলে দেওয়ার রাজনীতি নয়। 
অনেকে প্রশ্ন করেন, শুধুই একটা নির্বাচনের জন্য এত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন? নিশ্চয়ই না১ তারা জীবন দিয়েছেন গণতন্ত্রের জন্য; মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য; বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য। বেঁচে থাকা মানে কোনো রকম প্রাণ নিয়ে টিকে থাকা নয়। বেঁচে থাকার অধিকার মানে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার অধিকার। 

সংবিধানে বেঁচে থাকার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু সেখানে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মতো অধিকার, যা না হলে বেঁচে থাকাকে বেঁচে থাকা বলা যায় না, তার ঠাঁই হয়েছে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে, যা রাষ্ট্র সময়-সুযোগমতো বাস্তবায়ন করবে– বলা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও তার প্রায় কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। মানুষ তাই সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি; থাকেওনি।  
সে পথে এগিয়ে চলায় সুষ্ঠু নির্বাচন প্রাথমিক ধাপ। কারণ ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন হতে থাকলে সাধারণের এই দাবির প্রতি অনাদিকাল উদাসীন থাকা যায় না। এবারের নির্বাচনে দারিদ্র্য-পীড়িত অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করেছে। খোদ ঢাকা-১৭ আসনে ভাবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াত প্রার্থীর ভোটের ফারাক খুব বেশি নয়। এর পেছনে সে আসনের অধীন কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার পর তাদের কার্যক্রম হয়তো বড় ভূমিকা রেখেছে। 

ভোটের আগে অর্থ দিয়ে ভোট কেনা ভোটের আইনে অপরাধ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাউকে আর্থিক কিংবা অন্যান্য সহযোগিতা করা এবং দিন শেষে তার কাছে ভোট প্রার্থনা করাও কি ভোট কেনা নয়? এটা হয়তো দীর্ঘ বিতর্কের বিষয়। কিন্তু এ সুযোগ ততদিন পর্যন্ত থাকবে, এমনকি বাড়তেও থাকবে, যতদিন না সরকার প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়াবে। 
এবারের নির্বাচনে ভোট চাওয়ার আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল দলগুলোর তরফ থেকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। সেটা বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের তরফ থেকেই দেওয়া হয়েছে। সেটা যে কেবল সরকারে গেলেই দেওয়া হবে, তা নয়। বরং নির্বাচানের আগেও দল হিসেবে কারা পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেলে যাওয়া কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে পারবে– সেটা বিবেচনায় ছিল ভোটের হিসাবনিকাশে।

রাজনৈতিক দলের কাজ অবশ্য সরকার পরিচালনার ভার নেওয়া, নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা অন্নসংস্থানের মতো কাজ করে বিকল্প সরকার হয়ে ওঠা নয়। সরকার যতদিন নিজের কাজ করতে ব্যর্থ হবে, তা সে মৌলিক চাহিদা পূরণেই হোক আর নিরাপত্তা দেওয়াতেই হোক, ততদিন পর্যন্ত সে ব্যর্থতার সুযোগ কেউ না কেউ নেবে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। সে পরিবর্তনের হাওয়া এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবন ছুঁয়ে যায়নি– এ কথাও সত্য। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে চাই, দেশের রাজনীতিবিদরা এই নতুন বাস্তবতা আমলে নিচ্ছেন। পুরোনো কায়দায় যদি আবারও নির্বাচনে জিতে আসাকে পাঁচ বছরের লুটপাটের অনুমোদন হিসেবে নেওয়া হয়, তবে সামনে সমূহ বিপদ।

এসব ব্যাপারে শীর্ষ নেতৃত্বের উপলব্ধি এবং মাঠ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ পৌঁছানো বেশ কঠিন। গত দেড় বছরে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাস থামেনি; মুখগুলো বদল হয়েছে কেবল। নির্বাচনের আগে কোথাও কোথাও তাতে রাশ টানতে পেরেছে বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় বসেই যদি দ্বিগুণ উদ্যমে সে রাজনীতিই আবার শুরু হয়, তা হবে হতাশাজনক। 
মুখে নির্বাচনী জোট বললেও নির্বাচনের পরেও এখন পর্যন্ত জামায়াত এবং এনসিপির আলাদা অবস্থান দেখা যায়নি। এই অবস্থায় দেশ স্পষ্টতই বিএনপি এবং জামায়াত– এই দুই শিবিরে ভাগ হয়ে আছে। বাম ঘরানা থেকে মনীষা চক্রবর্তীর মতো হাতেগোনা দু-একজন কিছুটা সম্ভাবনা জাগালেও সংসদে জায়গা করে নিতে পারেননি। তাই মধ্য-ডান এবং ডানপন্থি শিবিরের দাপটে এখনও এ দেশে মধ্য-বাম এবং বাম ঘরানার রাজনীতির শূন্যতা আছে। সে জায়গা কেউ অধিকার করতে পারবেন কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে। 

মানজুর-আল-মতিন: আইনজীবী ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×