উন্নয়ন
নারীবান্ধব সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও ফ্যামিলি কার্ড
শশাঙ্ক সাদী
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঈদুল ফিতরের আগে আটটি উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাইলট প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাম্প্রতিক এ পদক্ষেপ শুধু নীতিগত পরিবর্তনের চেয়েও বেশি কিছু। এটি বাংলাদেশের সামাজিক চুক্তির একটি কাঠামোগত বিবর্তন। আমাদের জাতীয় সহনশীলতার নীরব স্থপতি ‘পরিবারের নারীপ্রধানকে’ প্রাথমিক কার্ডধারী হিসেবে মনোনীত করে রাষ্ট্র তার কল্যাণমূলক এজেন্ডাকে পারিবারিক অর্থনীতির প্রমাণিত গতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করছে। এটি শুধু তহবিল বিতরণ নয়; জাতীয় উন্নয়নে একটি হাতিয়ার হিসেবে মাটির ব্যাংকের শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়। এটি এমন এক ডিজিটাল ঢাল, যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি একটি জাতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে নকশা করা হয়েছে বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।
নারীবান্ধব সামাজিক সুরক্ষার ফল
এই পারিবারিক কার্ড এজেন্ডা কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত মা ও শিশুর উপকার প্রকল্পের (মাদার অ্যান্ড চাইল্ড বেনিফিট প্রোগ্রাম-এমসিবিপি) সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে বলেই মনে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের এমসিবিপি প্রকল্প ৬০ লাখেরও বেশি মায়ের সেবা প্রদান করে। ইউনিসেফ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, এমসিবিপি প্রকল্পের মাধ্যমে নগদ অর্থ স্থানান্তরের নিয়ন্ত্রণ নারীর হাতে দেওয়ার ফলে ২০ শতাংশ বেশি পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যগত ফল পাওয়া গেছে।
পারিবারিক কার্ড প্রকল্পের কাঠামো অনুযায়ী ‘নারী প্রথম’ যুক্তিকে ব্যক্তি পর্যায় থেকে পুরো পরিবারে ছড়িয়ে দেবে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকা একটি মূলধন হিসেবেই কাজ করবে।
নগর বনাম গ্রামীণ সংকটের উপযুক্ত ঢাল
ভেবে নেওয়া যায় যে, পারিবারিক কার্ড প্রকল্পটি বাংলাদেশের দারিদ্র্যের দ্বৈত প্রকৃতি মোকাবিলার জন্য অনন্যভাবে তৈরি করা হয়েছে। গ্রামীণ কেন্দ্রস্থলে কার্ডটি কর্মহীন মৌসুমে ‘দুর্দশা বিক্রয়’ অর্থাৎ ঘরের ছোটখাটো সহায়-সম্বল বিক্রি করে পরিবার চালানো থেকে সুরক্ষা প্রদান করবে এবং হতদরিদ্র ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক এবং জেলেদের সহায়-সম্বল টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। শহরের দরিদ্র মানুষের বসতি, যাকে আমরা বস্তি বলি, সেখানে থাকা গৃহ শ্রমিক, পোশাক শ্রমিক বা দিনমজুরের মতো মানুষের জন্য উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে পারিবারিক কার্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। উভয় ক্ষেত্রেই পারিবারিক কার্ড গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের চাপ কমাতে এবং দেশব্যাপী মর্যাদার ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা তৈরিতে ভূমিকা পালন করবে।
ত্রাণ ভাবনা ভেঙে আগাম পদক্ষেপ ভাবনা
ভালো করে দেখলে বলা যায়, পারিবারিক কার্ডের আসল উদ্ভাবন এর দুর্যোগের আঘাত প্রতিরোধ করার নকশার মধ্যে নিহিত। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় পারিবারিক কার্ড ব্যবস্থা দুর্যোগের আগে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে রাষ্ট্র এখন যে কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার পরে দুর্যোগ আঘাত হানার ৪৮ ঘণ্টা আগেই যে কোনো মোবাইল অ্যাকাউন্টে ‘টপ আপ’ করতে সক্ষম। বন্যা বা উচ্চমাত্রার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা সরবরাহ করলে পরিবারগুলো নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে এবং গবাদি পশুর সুরক্ষা দিতে পারবে। এতে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন খরচ একটি নির্দিষ্ট শতাংশে কমে যাবে (সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে এটি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে)।
ছিদ্র বা লিকেজ সংকটের অবসান
বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা জাল দীর্ঘদিন ধরে নানা রকম ‘বিভাজন সংকট’-এ বাধাগ্রস্ত। ঐতিহাসিকভাবে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোর প্রায় ৩০ শতাংশ সুবিধা অ-দরিদ্র পরিবারগুলোতে পৌঁছেছিল। এর মূল কারণ পুরো প্রক্রিয়ায় নানা রকম ছিদ্র বা লিকেজ; তা পণ্যভিত্তিক বিতরণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক তালিকা তৈরি ইত্যাদি। পারিবারিক কার্ড প্রকল্পের মাধ্যমে আশা করা যায়, ‘দুস্থ নারী সুবিধা’র মতো ৯৭টির বেশি খণ্ডিত সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পকে একটি একক ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে এনে এবং খাদ্য সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে অন্তর্নিহিত পরিবহন ও বিতরণ ছিদ্র বা লিকেজ দূর করে সরকার ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করছে। এই ‘একত্রীকরণ লভ্যাংশ’ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলোকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী এবং ব্যবস্থাপনায় সহজ একটি বারকোড দেওয়া লাইফলাইনে রূপান্তর করতে পারবে বলে আশা করা যায়।
এ প্রচেষ্টার সাফল্যের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট প্রয়োজন। উন্নয়ন অংশীদারদের যেমন বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ ইত্যাদি অবশ্যই তাদের জলবায়ু পরিবর্তন তহবিলকে এই ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে এই ডিজিটাল সুবিধার মূল্য সংরক্ষণের জন্য ‘শূন্য ফি’তে নগদ অর্থ স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বাজেটের সঙ্গে পারিবারিক কার্ড নামে নতুন প্রকল্পের আর্থিক চাপ একটি উদ্বেগের বিষয়। অন্যদিকে দেখলে এটি জাতিকে ‘খয়রাতি ত্রাণ’ ভাবনা থেকে ‘অধিকারভিত্তিক সহায়তা’ ভাবনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশকে ‘দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনা’র দেশ থেকে ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা’র দেশে রূপান্তরিত করবে।
পারিবারিক কার্ড বাংলাদেশে নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করার আরও একটি পদক্ষেপ। এর ফলে ভবিষ্যতে সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িত নারীরা যে কোনো জাতীয় দুর্যোগের সময় একটি সুরক্ষা জাল তৈরি করবে এবং বাংলাদেশকে দুর্দশার কবল থেকে বের করে আনবে।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
- বিষয় :
- উন্নয়ন
