ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্ষমতায়ন

সংরক্ষিত নারী আসন ও পাপলু সিনড্রোম

সংরক্ষিত নারী আসন ও পাপলু সিনড্রোম
×

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১ | আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সপ্তম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ছিল বিজয়ী দলের জন্য একচেটিয়া সুযোগ। ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪ মূলে ওই সংরক্ষিত নারী আসনগুলো সংসদে দল বা জোটের আনুপাতিক হারে বণ্টনের সঙ্গে সেসব আসনের জন্য নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। বিলোপ ঘটে ‘উইনার টেকস অল’ নীতির।

তবে এই আইনে সংকট তৈরি হয় অন্যত্র। এর ধারা ৩-এর উপধারা ৬-এ বলা আছে, ‘কোন নির্দলীয় সদস্য … কোন রাজনৈতিক দল বা জোটে যোগদান না করিয়া তিনি অন্য কোনো নির্দলীয় সদস্যের সহিত একত্রিত হইয়া কোনো স্বতন্ত্র নামে নির্দলীয় জোট গঠন করিতে পারিবেন এবং উক্তরূপ জোট গঠন করিলে নির্বাচন কমিশন উক্ত জোটের নামে জোটের অন্তর্ভুক্ত সদস্যের জন্য একটি পৃথক তালিকা প্রস্তুত করিবে।’ এই উপধারা থেকেই পাপলু সিনড্রোম শুরু। এবং সেটা শুরু হয় ২০১৮ সালের একাদশ সংসদে।

অষ্টম, নবম ও দশম সংসদে হিস্যা অনুযায়ী স্বতন্ত্র নারী সদস্য পাওয়ার সুযোগ থাকলেও স্বতন্ত্র সদস্যরা জোট বেঁধে সে সুযোগ গ্রহণ করেননি। তারা সরকারি বা বিরোধী জোটের সঙ্গে থেকেছেন। ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’ বলে কথিত সেই একাদশ সংসদ নির্বাচনে জনৈক মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম, যিনি ‘পাপলু’ নামে সমধিক পরিচিত, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। সে নির্বাচনে দুজন স্বতন্ত্র সদস্য বিজয়ী হন। জনাব পাপলু একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক, ধনী ব্যবসায়ী। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রার্থী হলেও আওয়ামী লীগ মহাজোট গঠন করায় তাঁর আসন লক্ষ্মীপুর-২ এ জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। পাপলু স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং কথিত আছে, তিনি মহাজোটের প্রার্থীকে নিষ্ক্রিয় হতে উৎসাহিত করেন ও নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিজয়ী হয়ে তিনি কেবল নিজের আসন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেননি; স্ত্রীকেও সংসদ সদস্য করার ছক কষেন। ওই নির্বাচনে বিজয়ী আসনের ভিত্তিতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪৩টি, জাতীয় পার্টি চারটি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি ও ওয়ার্কার্স পার্টি একটি আসনের হকদার হয়। এই চারটি দলের বাইরে যারা সংসদে আসন লাভ করেছেন– এমন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র সদস্যরা মিলে একটি আসনের ভাগীদার হন। আইনে এই সুযোগটি দেওয়া আছে ও পাপলু সেই সুযোগ গ্রহণ করে তাঁর স্ত্রী সেলিনা ইসলামকে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত করিয়ে আনেন। পাপলু কুয়েতের আদালতে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ থেকে বহিষ্কৃত হন। কিন্তু সেলিনা ইসলাম সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করেন।

‘আমি-ডামি’খ্যাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদে নির্দলীয়ভাবে ৬২ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তারা সংরক্ষিত নারী আসনের দাবিদার হননি। দেখা যাচ্ছে, ২০০৪ সালে সংখ্যানুপাতিক হারে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন পদ নির্ধারিত হওয়ার পর দীর্ঘ ২০ বছরে ৫টি সংসদের মধ্যে একটিমাত্র সংসদে সংরক্ষিত আসনে একজনই নারী স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ত্রয়োদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হবে। এ লেখার উদ্দেশ্য হলো, এবার তাহলে কী হবে? স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা কি ওই পাঁচটি সংসদের ধারা অনুসরণ করবেন, না পাপলু সিনড্রোমে ভুগবেন?
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয় পায়। আসন অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের মধ্যে দলটি পাবে ৩৫টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি আসন পাবে। অন্য তিনটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও নিজস্ব প্রতীকে জয়ী ছোট দলগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে। দলগুলো হলো বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিস।’ (প্রথম আলো, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রকৃত অর্থে গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও গণঅধিকার পরিষদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে জোট করে এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত মজলিস জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করায় সংরক্ষিত নারী আসনে তারা পূর্ব জোটেই থাকবে বলে ধরে নেওয়া স্বাভাবিক। তাহলে বাকি থাকল স্বতন্ত্র সাতজন সদস্য। উল্লিখিত আইনের ৩ ধারার ৮ উপধারা অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের ২১ দিনের মধ্যে কোনো নির্দলীয় সদস্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটে যোগদান না করলে নির্বাচন কমিশন তাদের নাম নির্দলীয় সদস্য তালিকা নামক একটি স্বতন্ত্র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এই তালিকাভুক্ত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি নির্দলীয় জোট গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। নির্বাচন কমিশন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে সেই গেজেট প্রকাশ করেছে। এখনও নির্দলীয় সদস্যরা কোনো দলে যোগ দেননি। সে হিসেবে পাপলু সিনড্রোম দেখার সুযোগ এখনও রয়ে গেছে।

কিন্তু রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী বিধায় দলের নারী নেতা ও কর্মীদের মধ্যে কাউকে কাউকে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত করে তাঁর রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি প্রদান করবে। নির্দলীয় সদস্যরা কোনো একক আদর্শ বা নেতৃত্বে পরিচালিত নন। তাদের সংরক্ষিত নারী আসনের হিস্যা দাবি করা কতটা ন্যায্য? আর ‘পাপলু সিনড্রোম’ বলতে একাদশ সংসদে যা দেখেছি, তার কদর্য রূপের পুনরাবৃত্তিই বা হবে কেন?

পাপলু সিনড্রোম এড়িয়ে সংসদে বরং নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক নারী নেত্রীদের একটু বেশি সংখ্যায় আগমনের পথ সুগম করাই কি গ্রহণযোগ্য নয়?

আকম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×