ইরান
খামেনির ‘শাহাদাত’ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করবে
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
বাকির সাজ্জাদ সৈয়দ
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬ | ১২:০৯
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সমন্বিত বিমান হামলায় নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ড কেবল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্যই নয়, সমগ্র পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের জন্যও ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ঘটনা। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে এমন এক ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও ধর্মীয় কাঠামোর শীর্ষে অবস্থান করেছিলেন। তবে যারা মনে করছেন, এর ফলে ইরানের শাসন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক ভেঙে পড়বে; তারা দেশটির কাঠামো ও ইতিহাস উভয়ই ভুলভাবে মূল্যায়ন করছেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি পররাষ্ট্রনীতি, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিপ্লবের নীতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। মারজায়ে তাকলিদ হিসেবে তিনি শিয়াদের মধ্যে এমন এক ধর্মীয় নেতা ছিলেন, যা ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। তাঁর মৃত্যু ব্যক্তিগত শূন্যতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতাও সৃষ্টি করেছে। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেম নিয়ে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে।
গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আলেম আলি রেজা আরাফিকে ইরানে অন্তর্বর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ধারণা করা হয়েছিল, খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে পারেন আরাফি। প্রয়াত ইব্রাহিম রাইসি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। অতীতের সংকটকালে খামেনি নীরবে তিনজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি চিহ্নিত করেছিলেন বলে যে প্রতিবেদন রয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় পূর্বপ্রস্তুতি ছিল, যদিও নামগুলো প্রকাশ করা হয়নি।
টিকে থাকতে ইরানের গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা
সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডে ইরান নিশ্চয় শোকাহত, তবে এতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। ইরানের শাসন ব্যবস্থা একক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ধর্মীয় নেতৃত্ব, নিরাপত্তা বাহিনী, আমলাতন্ত্র এবং ‘উহলিয়াতে ফকিহ ডকট্রিন’ তথা ইসলামী আইনজ্ঞদের অভিভাবকত্বের ওপর। ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে এ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতা রয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্থিতিশীলতার রক্ষক হোক বা প্রভাবশালী বাহিনী হিসেবে ভাঙন ঠেকানোই তাদের অগ্রাধিকার হবে।
তবে এর অর্থ এই নয়, কোনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দেবে না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যে সমাজে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং সময়ে সময়ে অস্থিরতা উস্কে দিয়েছে। পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে গোষ্ঠীগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সামনে আসতে পারে।
কঠোরপন্থি কেউ নির্বাচিত হলে আদর্শিক কঠোরতা আরও জোরদার হতে পারে। তুলনামূলক মধ্যপন্থি আলেম নির্বাচিত হলেও পশ্চিমের প্রতি তাৎক্ষণিক নমনীয়তা প্রত্যাশিত নয়। কারণ অবরুদ্ধতার মুহূর্তে শাসন ব্যবস্থা সাধারণত আপস নয়, শক্তির প্রদর্শনকেই অগ্রাধিকার দেয়।
ইরানের নিজস্ব ইতিহাস হলো, দেশটি আগাম মৃত্যু ঘোষণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে থাকে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র অতীতে আরও বিপজ্জনক মুহূর্ত অতিক্রম করেছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যখন বিপ্লবের নতুন সময় ছিল তখন ইরান আগ্রাসন, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছিল। তারপরও পিছু হটার বদলে তারা বিপ্লবী উদ্দীপনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মাধ্যমে সমাজকে সংগঠিত করে। তখন বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে ইরান এবং অবরোধের মধ্যেও টিকে থাকার জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে।
১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের দুই বছর পরই ১৯৮১ সালে হাফতে তির বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। মুজাহিদিন ই খালকের সেই নৃশংস বোমা হামলায় সে সময় ইরানের ৭৪ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। তাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ বেহেশতি ও একাধিক মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। এটি ছিল নবীন বিপ্লবের হৃদয়ে আঘাত হানার চেষ্টা। তবুও ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি; দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং উহলিয়াতে ফকিহ ডকট্রিন আরও সুসংহত হয়।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যাকাণ্ডের বাহ্যিক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক, যাকে প্রায়ই ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বলা হয়, যার মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিরা রয়েছে, তারাও তাদের সামর্থ্য অনুসারে হামলা জোরদার করতে পারে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু শাহাদাত হিসেবে বিবেচিত হবে। শাহাদাত এমন এক বয়ান, যা ধর্মতত্ত্বে গভীর এক দ্যোতনা সৃষ্টি করে, যা ইরাক থেকে বাহরাইন এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল তথা সারা পৃথিবী পর্যন্ত সমর্থকদের সংগঠিত করতে পারে। ইসরায়েল এই অভিযানের মাধ্যমে প্রধান প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হলেও গভীর অনিশ্চয়তার সূচনা করেছে। খামেনি ইসরায়েলের কট্টর বিরোধী হলেও খুব কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। সংকটকালীন নেতৃত্ব চাপের সময়ে দৃঢ়তা প্রদর্শনের কারণে হয়তো কম সংযত হতে পারে। সে জন্য উপসাগর থেকে লেভান্ত অঞ্চল তথা সিরিয়া, লেবানন ও জর্ডান পর্যন্ত বহুমুখী সংঘাতের আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের কৌশলগত জুয়া
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডকে ‘ন্যায়বিচার’ এবং ইরানিদের জন্য দেশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। স্থল অভিযান বা সুসংগঠিত অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ছাড়া কেবল বিমান হামলা করে একটি দেশের বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করা বিরল ঘটনা। এতে বরং বহিরাগত হামলার কারণে স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতাসীনদের আরও ঐক্যবদ্ধ করে এবং দেশের ভেতরের ভিন্নমত কমিয়ে আনে।
অতএব এই কৌশলগত পদক্ষেপ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদি প্রতিশোধমূলক হামলা পশ্চিম এশিয়াজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে আঘাত হানে, তবে ওয়াশিংটন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ছাড়াই গভীরতর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষয় হলে পাল্টাপাল্টি হামলা বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। অধিকন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে গেলে তা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। নিকট ভবিষ্যতে সে সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। যদিও নিরাপত্তার কারণে অবিশ্বাসপ্রবণরূপে আবির্ভূত হতে পারে।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরানের বিপ্লবী ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি বটে। তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবে না, যা হামলার নির্দেশদাতাদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এটি অনিশ্চয়তার এক নতুন সময়ের সূচনা করেছে। ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র হতাহত হয়েছে, তবে দুর্বল নয়। যদিও এ অঞ্চল অস্থির ও আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশ্ব হয়তো শিগগিরই উপলব্ধি করবে, একজন মানুষকে সরিয়ে দেওয়া সহজ হলেও তিনি যে ব্যবস্থাটি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন, তার রূপান্তর অনেক কঠিন।
বাকির সাজ্জাদ সৈয়দ: ডনের বিদেশ ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা; ডন থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর
- বিষয় :
- ইরান
- ইরানে আগ্রাসন
- আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
