ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গণঅভ্যুত্থান

অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা: শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশ

অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা: শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশ
×

রুস্তম আলী খোকন

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে প্রায় ১৮ বছর পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি আবারও মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেছে। নয়া সরকার দায়িত্ব নিয়েই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরাকে তাদের প্রথম কাজ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এমনটাই দেশবাসীকে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। বাংলাদেশে ক্ষুধায় প্রাণ ওষ্ঠাগত এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন তিন কোটি ৬০ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ এখন দরিদ্র। বেকারত্ব, এনজিও ঋণের চাপে দরিদ্রদের কেউ কেউ আত্মহত্যা করছে। সপরিবারে আত্মহত্যার নির্মম চিত্রও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনীতি নিয়ে যত হইচই হয়েছে, অর্থনীতি নিয়ে তেমনটা হয়নি। সে সরকারের কাছে যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে ঘটেছে তার ঠিক উল্টো। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি, বরং আগের বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে সাড়ে ৩ শতাংশেরও নিচে; তিন বছর আগেও যা ছিল গড়ে ৬ শতাংশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বন্যায় দেশ ভেসে যাবে– এমন বক্তব্যের বিপরীতে কর্ম হারিয়ে বেকার হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ। অথচ চাকরিতে বৈষম্য রোধ করে কর্মসংস্থান ইস্যু নিয়েই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন।

এ ধরনের গণঅভ্যুত্থান এর আগে শ্রীলঙ্কায় ঘটেছে। ২০২২ সালের এপ্রিল-মে মাসের সেই অভ্যুত্থানের পর শ্রীলঙ্কাতেও একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। আমাদের পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালেও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে নেপালের কেপি ওলি শর্মার সরকার। সেখানেও একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা সংবিধান-সংসদ কিছুই ভাঙেনি। সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নির্বাচন করেছে। স্বল্প পরিচিত এক বামপন্থি ও মধ্যবাম দল-সংগঠনের জোট ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার নেতা অনুড়া কুমার দিশানায়েকে রাষ্ট্রপতি হয়ে চমকে দিয়েছেন গোটা দুনিয়াকে। দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলন-পরবর্তী বিশৃঙ্খলাকারীদের দমন করেছে কঠোর হস্তে। মব ভায়োলেন্স নামে কোনো শব্দকে প্রশ্রয় দেননি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রণিল বিক্রমাসিংহে। দিশানায়েকে রাষ্ট্রপতি হয়ে পৃথিবীতে রেকর্ড করা মুদ্রাস্ফীতি ৭০ শতাংশ থেকে নামিয়ে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে মাইনাস ৪ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনে বিপরীত এক রেকর্ড সৃষ্টি করে চমকে দিয়েছেন পৃথিবীকে।

নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি ১২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা নিয়েই আন্দোলনের নামে যারা বিশৃঙ্খলা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ৫ মার্চ সেখানে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে। রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকে সই করা থেকে বিরত থাকছেন সুশীলা।
শ্রীলঙ্কায় রণিল বিক্রমাসিংহের অন্তর্বর্তী সরকার যে স্থিতিশীলতার ভিত সৃষ্টি করে দিয়েছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে দিশানায়েকে শ্রীলঙ্কাকে ঘুরিয়ে দিতে পেরেছেন। সুশীলা কার্কিও সেই পথে হাঁটছেন। ৫ মার্চের পর নেপালের নয়া নেতৃত্বও হয়তো শ্রীলঙ্কার মতোই সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করবেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কী করেছে? দলটির নেতাদের আলোচনায় স্পষ্ট, নানা কৌশল করেই বিএনপি জোটকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করতে হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র হিসাব কষে জানিয়ে দিচ্ছে– ২০২৫ সালে মব ভায়োলেন্সে নিহত হয়েছে ১৯৭ জন। এর আগের বছরে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে ৩৮ জন। ২০২৫ সালে ৪০১ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে ১০২ জন; আহত ৪৮৪৪ জন। ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে তিনজন নিহত এবং চারজনের মৃত্যু রহস্যজনক। সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সময়ে একাধিকবার একাধিক স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলা, হত্যা, বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

আগস্ট আন্দোলনের পরই মব জাস্টিস নামে এই বিশৃঙ্খলাকে সমর্থন জোগানো হয়েছে। আদতে যা রাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে দুর্বল করার একটি পদক্ষেপ মাত্র। মব ভায়োলেন্স এক ধরনের অপরাধও বটে।
স্পষ্টত, বাংলাদেশের নয়া প্রধানমন্ত্রীর পথ অনেকটাই কণ্টকপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের অনেক মিল ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এমনভাবে কাজ করেছে, যা শ্রীলঙ্কার জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নেতার সংকট মোকাবিলার কাজ সহজ করেছে। যেমনভাবে কাজ করছেন নেপালের সুশীলা কার্কি নেপালের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য। তারেক রহমান অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। দিশানায়েকের দেশে সংবিধান, সংস্কার, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, স্বাধিকার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার টুঁ শব্দটি করেনি। এখন দেখার পালা– অভিজ্ঞতাবিহীন শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি দিশানায়েকের মতো অভিজ্ঞতাবিহীন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সত্যি সফল হতে পারেন কিনা। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’– এ স্লোগান বিশাল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য, নাকি মুষ্টিমেয় ধনিক আমলা শ্রেণির জন্য? 

রুস্তম আলী খোকন: কলাম লেখক ও সংগঠক

আরও পড়ুন

×