অর্থনীতি
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও জনশক্তির বিপদ
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৬ | আপডেট: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন দেশের ভেতর থেকেই বিরাজ করছে নানা সংকট। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলও কিছু সংকট দিয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলের পুঞ্জীভূত সংকটও মোকাবিলা করতে হবে। এসব নিয়ে চ্যালেঞ্জে আছে সরকার। এ অবস্থায় তারা গুছিয়ে বসার আগেই দেশের বাইরে সৃষ্ট সংকটও সরকারকে পেরেশান করবে বলে মনে হচ্ছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি বাংলাদেশকেও পাবে, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়।
এর আগে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ হয়েছিল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে। তাতে সংকট তীব্র হয়ে ওঠেনি, যদিও তখন শঙ্কা ছিল জ্বালানি সরবরাহের জন্য জরুরি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে। এবার সত্যি সত্যিই এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে আক্রান্ত ইরান। তাদের সর্বোচ্চ নেতাসহ অনেককে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশেও পাল্টা আঘাত হানছে। কেননা, ওইসব ঘাঁটি ব্যবহার করে এমনকি বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়ে শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। এ অবস্থায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ব্যবসাকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ‘প্রয়োজনীয় বার্তা’ দিতে চাইছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াটাও এরই অংশ হয়তো।
এ অবস্থায় আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত। সরকার অবশ্য বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের কতদিনের মজুত আছে, সেটি জানিয়ে আশ্বস্ত করতে চাইছে। যুদ্ধ প্রলম্বিত না হলে এবং জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হলে অবশ্য সংকট দেখা দেবে না। জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা বলা যায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এলএনজিনির্ভরও হয়ে পড়েছি। এ ক্ষেত্রে অনেকখানি নির্ভরশীল কাতার, ওমানের ওপর। সেখান থেকে তেল-গ্যাস আসে হরমুজ প্রণালি দিয়েই। ফলে এ সমুদ্রপথ মুক্ত না হলে আমরা সংকটে পড়ব। এ অবস্থায় আমদানিকারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে বাড়বে জ্বালানি নিয়ে কাড়াকাড়ি ও এর দাম। এরই মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়ার খবর রয়েছে। বাড়ছে ডলার ও সোনার দাম। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হবে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে কিন্তু এটা কমে আসার প্রবণতা ছিল স্পষ্ট।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পেরিয়েছে। এতে যুদ্ধরতদের পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোও কম ক্ষতিগ্রস্ত নয়। ওই যুদ্ধে বাংলাদেশেও বেড়েছিল মূল্যস্ফীতি; ঘটেছিল রিজার্ভ ক্ষয়। জ্বালানি থেকে খাদ্যশস্যের বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল হওয়াতেই এসব ঘটেছিল। দুনিয়াকে চাপে ফেলেছিল কভিড পরিস্থিতিও। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না আসতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করল, সেটা এক জ্বালানির বাজারকে অস্থির করেই যে কোথায় নিয়ে যাবে, কে জানে! যুদ্ধ বন্ধের আন্তর্জাতিক উদ্যোগও পরিলক্ষিত নয়। এর প্রধানতম লক্ষ্য নাকি ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’। কিন্তু ইরান ভিন্ন প্রকৃতির দেশ। হালে অনেকটা মিত্রহীন হলেও তারা সহজে আত্মসমর্পণ করবে বলে মনে হয় না। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর বিষময় ফল আমরা এড়াব কীভাবে!
এমন পরিস্থিতিতে সব দেশই যার যার স্বার্থ দেখতে চায়। বাংলাদেশ সরকার শুরুতে যে বিবৃতি দিয়েছিল, তাতে ছিল এরই প্রতিফলন। ইরান যেসব দেশে পাল্টা হামলা চালাচ্ছিল, সেগুলোয় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। দুর্ভাগ্যবশত তারাও পড়েছেন ইরানের হামলার মুখে। তাদের জীবনের নিরাপত্তা জরুরি অগ্রাধিকার। সরকার পরে অবশ্য ইরানি নেতাসহ তাদের প্রথম সারির কর্মকর্তাদের কাপুরুষোচিতভাবে হত্যার নিন্দা করেছে। যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। যে কোনো বিবেকবান মানুষ বলবে, এটা অন্যায় যুদ্ধ। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশে বাংলাদেশের দুই প্রবাসী কর্মজীবী মারা গেছেন ইরানি হামলার শিকার হয়ে। কয়েকজন আহত। লাশও বাংলাদেশে আনা যাচ্ছে না বিমান চলাচল কার্যত ভেঙে পড়ায়।

ইরানেও কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী আছেন বাংলাদেশের। আছেন অল্প কিছু পেশাজীবী। সম্পর্ক ঐতিহাসিক হলেও দেশটির সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য এখন খুবই সামান্য। তবে বাংলাদেশের নাগরিক যারা ইরানে রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। আক্রান্ত ইরানও হয়তো শিগগিরই যুদ্ধ থামতে দেবে না। এ অবস্থায় ইরানে হামলা আরও জোরদার হলে আমাদের মানুষজনের নিরাপত্তাও হয়তো বিপন্ন হবে। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যেসব বাংলাদেশি আছেন, তাদের সবাইকে এ মুহূর্তে আশ্বস্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় সব কিছুই করা হবে বলে বার্তা দেওয়াটা জরুরি। দেশে তাদের স্বজনরাও আছেন উৎকণ্ঠায়।
এ মুহূর্তে যারা কাজের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যেতে প্রস্তুত, তারাও আটকা পড়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছাতে না পারলে কী হবে, সেটা নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা স্বাভাবিক। অনেকে দেশে বেড়াতে এসেও আটকা পড়েছেন। এ অবস্থায় পররাষ্ট্র, প্রবাসীকল্যাণ ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। দায়িত্ব গ্রহণ করেই এসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা পড়েছেন সংকটে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি কর্মকর্তাদেরও অভিজ্ঞতা কম। কেননা, প্রায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এ ধরনের সংকট অতীতে কখনও দেখা দেয়নি। সংঘাতময় পরিস্থিতি বা যুদ্ধের কারণে হয়তো দু-একটি দেশে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে সংকট উপস্থিত হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তাদের জীবিকাও তো রক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওইসব দেশও নিশ্চয় পরিস্থিতি সামাল দিতে এগিয়ে আসবে। তাদেরও কর্মজীবী প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি করতে দিয়েই তারা মূলত এ পরিস্থিতিতে পড়েছে। এটা তো তাদের যুদ্ধ নয়। এতে আমাদের প্রবাসী শ্রমজীবীদেরও কোনো স্বার্থ নেই। বরং তাদের উৎকণ্ঠা ও অকল্যাণ নিহিত।
ওইসব দেশে ভারত, পাকিস্তানসহ আরও যেসব দেশের শ্রমজীবী আছেন, তারা কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাজের সমন্বয়ও হয়তো সবাইকে লাভবান করবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আমরা কিছু পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করতাম। সেগুলোও পাঠানো যাচ্ছে না। উদ্ভূত সংকটে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বাজারে পণ্য পাঠানোও অধিক ব্যয়বহুল হবে ঘুরপথে যেতে হলে। সময়ও বেশি লাগবে। হালে আমাদের রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো নয়। এরই মধ্যে বাড়তি এ সংকট এসে হানা দিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অন্তত কিছু স্থান থেকে প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার মতো কাজেও সরকারকে নিয়োজিত হতে হবে কিনা, কে জানে! এর মধ্যে জ্বালানির অনিশ্চিত সরবরাহ ও বাড়তে থাকা দাম গোটা ব্যবস্থাপনাকে করে তুলতে পারে কঠিন চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সামনেই ভরা বোরো মৌসুম। সেচে বাড়বে ডিজেলের চাহিদা। চলছে রোজার মাস। সেটা শেষ হতে হতে গ্যাস সংকটে লোডশেডিংও হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ।
কোনো বিশেষ সমীকরণে শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ না হলে আসছে ঈদটা ভালো কাটাবে না আমাদের। এ সময়ে রেমিট্যান্স বেড়ে গিয়ে অর্থনীতি ও জনজীবন সজীব হয়ে ওঠার যে প্রবণতা থাকে, তা হয়তো মিস করতে হবে। এর মধ্যে সরকার চাইলেও অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সেভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না, যেহেতু বাইরে থেকে আসা সংকট সামাল দেওয়াটাই হবে জরুরি। এ অবস্থায় একটাই কামনা– যুদ্ধটা দীর্ঘায়িত না হয়ে দ্রুত শেষ হোক।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
