সাক্ষাৎকারে মাহমুদুর রহমান মান্না
নির্বাচিত সরকার এলেও রাজনৈতিক পরিস্থতি এখনও ধূসর
মাহমুদুর রহমান মান্না
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১০:৫৬ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১১:০০
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। একবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-চাকসুর সাধারণ সম্পাদক এবং টানা দুইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সহসভাপতি নির্বাচিত হয়ে রেকর্ড স্থাপন করেন। আশির দশকে তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন; এক পর্যায়ে সাংগঠনিক সম্পাদক হন। তাঁর জন্ম বগুড়া শহরে, ১৯৫১ সালে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন।
সমকাল: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছে প্রায় এক মাস, তবুও জামায়াতে ইসলামী ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নিয়ে অভিযোগ তুলেই যাচ্ছে। শুক্রবারও তারা এ অভিযোগ এনে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের গ্রেপ্তারের দাবিতে মিছিল-সমাবেশ করেছে। আপনি এ নির্বাচনে দুটো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কেমন দেখেছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: আপনার অবগতির জন্য বলছি, আমি দুটো আসনে দাঁড়ালেও ঢাকা-১৮ আসনটিতে শেষ পর্যন্ত লড়িনি। বগুড়া-২ আসনেই নির্বাচন করেছি।
সমকাল: হ্যাঁ, নির্বাচনের তিন দিন আগে আপনি ঢাকার আসনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। বগুড়ার অভিজ্ঞতাই বলুন।
মাহমুদুর রহমান মান্না: নির্বাচন নিয়ে আমি কোনো অভিযোগ করিনি। তবে এক কথায় বললে হতচকিত হয়েছি। আমি যে পরিমাণ ভোট পেয়েছি বলে দেখানো হয়েছে, তা আমাকে হতবাক করেছে। নির্বাচন কমিশন যদি এখন আমার এলাকায় গিয়ে দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিছু মানুষকে জিজ্ঞেস করে, তাহলেও দেখবে আমার ভোট অনেক বেশি। আমার বাড়ি যে পাড়ায় সেখানে ৩০০ ভোট আছে। এ ভোট একটাও ছুটার কথা নয়। আমার ইউনিয়নে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম। সেখানে এবার আমার ভোট দেখানো হয়েছে ২৩৭টা। অথচ আমার নিজেরই ভোট ওখানে ৩০০। আরেকটা বাড়ি আছে অন্য একটা ইউনিয়নে। সে বাড়িতে ১০৪ বা ১০৫টা ভোট আছে, সবকটি আমার। কিন্তু ওই পুরো ইউনিয়নে পেয়েছি ৫০ বা ৬০ ভোট। এখন ভোট ভালো হয়েছে– কীভাবে বলব! সকালবেলাতেই ঝামেলা করায় সেনাবাহিনী বিএনপির কয়েকজনকে আটক করেছিল, আবার ছেড়েও দিয়েছে দুই ঘণ্টার মধ্যে। বেলা ৩টার দিকে সেনাবাহিনী সরে গেছে, বিএনপিও আটঘাট বেঁধে নামে। এ নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা আছে।
সমকাল: আপনার কী ধারণা ছিল?
মাহমুদুর রহমান মান্না: ধারণা ছিল, আমার এবং জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জামায়াত ভোটও পেয়েছে অনেক। তবে যিনি জিতেছেন তিনি যে এত ক্ষমতাধর আগে জানতাম না। জানলে সেভাবেই বিএনপির সঙ্গে কথাবার্তা হতে পারত। সামগ্রিকভাবে এটুকু বলতে পারি, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে এ নির্বাচন স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন, প্রশ্নাতীত হয়েছে– তা মনে করি না।
সমকাল: বিএনপি তো আপনাকে আসনটা ছেড়ে দিয়েছিল। মাঝখানে কী হলো যে তারা নিজেরাই প্রার্থী দিলেন সেখানে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: আমাকে বস্তুত কিছুই জানানো হয়নি। বিএনপির প্রার্থী দেখে আমি বিএনপি নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টা। তখন খোদ তারেক রহমান বলেছেন, অন্যরাও বলেছেন যে, ব্যাংকে আমার ঝামেলার কারণে একটা সাপোর্টিভ ব্যবস্থা নিলাম; ডামির মতো। ব্যাংকের ঝামেলাটা ছিল বানানো। তারপর তারা দলবল নিয়ে গিয়ে বগুড়ায় আমার প্রার্থিতা বাতিল করাল। আপিল করার পর আমি টিকে গেলাম। এরপর যোগাযোগ করার চেষ্টা করলাম বিএনপি নেতাদের সঙ্গে– কোনো সাড়া মেলেনি।
সমকাল: বিএনপি কোনো ব্যাখ্যাই দেয়নি?
মাহমুদুর রহমান মান্না: না, কিছুই বলেনি।
সমকাল: আপনাদের যে জোট ছিল; গণতন্ত্র মঞ্চ, তার নেতারাও কিছু বললেন না?
মাহমুদুর রহমান মান্না: তখন তো গণতন্ত্র মঞ্চের সবাই ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’র মধ্যে ছিল। কে কার খবর রাখে!
সমকাল: নির্বাচন নিয়ে আপনার যে মূল্যায়ন তার ভিত্তিতে বলছি– বিরোধী পক্ষ, বিশেষত জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তার গুরুত্ব কতটা বা তা কতদূর যেতে পারে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যদিও পরে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, জামায়াত যে অভিযোগ করছে, তিনি সেটা বোঝাননি। কিন্তু খলিলুর রহমানের বিষয়টা কেমন না? যে সরকার নির্বাচন পরিচালনা করল, সে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। আবার নির্বাচনে বিজয়ী দলের সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেন! তিনি তো আগেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন। তবে আমি মনে করি, জামায়াতের আন্দোলনও খুব বেশি দূর যাবে না। তারা প্রশ্নগুলো তুলছে এবং পয়েন্ট তৈরি করছে– এর বেশি যাবে না। তবে নির্বাচন নিয়ে আমার মূল্যায়ন হলো, ভোট গ্রহণ ভালো হয়েছে, কিন্তু গণনা ও ফল ঘোষণা প্রশ্নবিদ্ধ।
সমকাল: জুলাই সনদ বা গণভোট নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়নি, আবার জামায়াত-এনসিপি তা নিয়েছে।
মাহমুদুর রহমান মান্না: দুটো শপথের বিষয়ে তো আমরা একমত হয়েছিলাম। বিএনপি এখন সংবিধানের প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু আমাদের যাত্রাটাই তো সংবিধানবহির্ভূত পন্থায় হয়েছে। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর সরকার যত কাজ করেছে তার কোনোটাই সংবিধানসম্মত ছিল না। সংবিধান রক্ষার শপথ তারা নিয়েছিল বটে, কিন্তু তাদের কোনো কাজই সে ধারায় হয়নি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা করে আমরা একমত হয়েছিলাম যে, সংবিধান রক্ষার পথে আমরা হাঁটিনি বিরাজিত অবস্থার কারণে। আমরা এটাও সবাই মেনে নিয়েছিলাম যে, গণতন্ত্রের স্বার্থেই ভোটের সঙ্গে গণভোট হবে, সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংসদে অনুমোদিত হবে। কিন্তু প্রথমেই বিতর্ক ওঠানো হলো। এটা গণতন্ত্রের জন্য ভালো হলো না। দেশের সার্বিক বিকাশের জন্যও ভালো হলো না। কোথায় যায় বিষয়টা এখন দেখা যাক। এ নিয়ে একটা জ্ঞানভিত্তিক লড়াই হওয়া দরকার; শুধু দলগুলো নয়, সিভিল সোসাইটিকেও এ বৃদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটা করতে হবে। তা না হলে এটা যে কোনো দিকে চলে যেতে পারে।
সমকাল: আপনি সরকারের জন্য কী কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: ১৪-১৫ দিনে তো একটা সরকার সম্পর্কে এভাবে বলা যাবে না। আরও দেখতে হবে। যে সরকারটা গঠিত হয়েছে তাকে আমি ৫০-৫০ মনে করি। যেমন একটা সরকার গঠিত হওয়ার পর জনমনে বেশ আশাবাদ তৈরি হয়– এ রকম কিছু আমি দেখছি না। আবার, দূর! এরা কিছু পারবে না– এ রকম কোনো প্রতিক্রিয়াও হয়নি। তবে শুরুতেই কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন, মেট্রোরেল পরিচালনাকারী ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির এমডিকে সরিয়ে দেওয়া, দুদক চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের পদত্যাগ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দুই-তৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ প্রক্রিয়াটা হওয়ার কথা ছিল গণতান্ত্রিক, যা দেখা যায়নি। মনে রাখতে হবে, সংসদে বিরোধী দল কত বড় সেটাই কেবল গুরুত্বপূর্ণ নয়; এখন মানুষও অনেক সচেতন। সামাজিক মাধ্যমে অনেক নেতিবাচক বিষয় থাকলেও মানুষ কিন্তু সেখানে খুব সক্রিয়, সতর্ক; চোখ-কান খোলা রাখছে। অর্থনীতির জন্য যে টিম বেছে নিয়েছে সরকার, তা কী করে দেখতে হবে।
সমকাল: সরকারের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ টিমের সক্ষমতা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: একটু অপেক্ষা করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধটা হঠাৎই এসেছে। অন্তত আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। বর্তমান সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, বোঝা যাচ্ছে না। এ যুদ্ধ মনে হচ্ছে চলবে অনেক দিন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী করবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। বলা হয়েছিল, আমাদের যথেষ্ট রিজার্ভ আছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। সব মিলিয়ে বলা যায়, পরিস্থিতি যতটা গুরুতর, সরকারের প্রস্তুতি ততটা নেই। তারপরও জোরালো মন্তব্য করতে হলে আরও কিছুদিন দেখতে হবে।
সমকাল: বিদ্যুৎমন্ত্রী যে বললেন, ঋণের বোঝা টানার চেয়ে লোডশেডিং সহ্য করা ভালো। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: মানুষ বিদ্যুৎমন্ত্রীর এ কথায় সায় দেবে বলে মনে করি না। যে ধরনের সরকার এমন কথা বললে মানুষ তা মেনে নিত, সে ধরনের সরকার এটা নয়। ফলে এগুলোর কোনো অর্থ নেই।
সমকাল: নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের কিছু কিছু তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। দেশের অনেক জেলা-উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খোলা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, সরকার বিষয়টাকে একটু নরম দৃষ্টিতে দেখছে। আপনার অভিমত কী এ ব্যাপারে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: নির্বাচনে জেতার জন্য দল বা দলের নেতারা বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের প্রতি একটা উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছিলেন। সেটা মাঠেই দেখা গেছে। কিন্তু সরকার এমন কোনো নীতি বা কৌশল নিয়েছে কিনা, সেটা জানি না। এ রকম নীতি-কৌশল নিয়ে সরকার জনপ্রিয় থাকতে পারবে? এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে জনমত গড়ে ওঠেনি। আওয়ামী লীগ যদি তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সে ধরনের কোনো আবেদন তৈরি করতে পারত, তাহলে সরকার দলটির প্রতি উদার নীতি নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, তা বলা যেত। কিন্তু সেটা তো হয়নি। অথচ এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩০-৪০টা কার্যালয় খুলে ফেলা, যদিও কিছু আবার বন্ধও হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তাই ওই প্রশ্নটা তৈরি হয়েছে।
সমকাল: বিএনপির মাঠ পর্যায়ের কেউ কেউ বলছেন যে, জামায়াতের ওষুধ হলো আওয়ামী লীগ। এটার মধ্যেও কি একটা উদার মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে না?
মাহমুদুর রহমান মান্না: আমার ধারণা, তারা প্রকাশ্যে এসব কথা বলতে পারবে না। জামায়াত একটা রাজনৈতিক শক্তি। তাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। সুতরাং এমন কথা উঠতে পারে না যে, বিএনপি পারবে না আওয়ামী লীগকে লাগবে জামায়াতকে মোকাবিলার জন্য। তখন তো দল হিসেবে বিএনপিরই প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না।
সমকাল: গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমাদের নেতা তারেক রহমানও বারবার বলেছেন, সবাইকে নিয়ে আমরা রাজনীতি করি; আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। এটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন আপনি?
মাহমুদুর রহমান মান্না: মঈন খান অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। তবে শুধু একাডেমিক জ্ঞান দিয়ে রাজনীতি চলে না; ব্যবহারিক বিষয়টাও খুব দরকার। উনি যেভাবে বলেছেন– প্রতিহিংসার রাজনীতি করতে চাই না, তার মানে কী? প্রতিহিংসা আপনাকে কে করতে বলেছে? আমরা আওয়ামী লীগের দুঃশাসন ও লুটপাটের, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চেয়েছি। সেটা কি প্রতিহিংসার পরিচায়ক? তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সরিয়ে দিলেন, আবার এদিকে বলছেন, আমরা আইনের শাসন চাই, বিচার কায়েম করতে চাই। কীভাবে হবে সেটা? নিশ্চয়ই প্রতিহিংসার রাজনীতি চাই না। তবে তা তো কেউ এখন করছে না, বিএনপিও করেনি। তাহলে এ কথা আসছে কেন? এটা এক ধরনের ভাসা ভাসা উপলব্ধি; কোনো গভীর উপলব্ধির কথা নয়।
সমকাল: বিএনপি-জামায়াত তো দীর্ঘদিন একসঙ্গে চলেছে। আবার এখন তারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। একে অপরের বিরুদ্ধে বেশ জ্বালাময়ী বক্তব্যও দিচ্ছে। সামনের দিনে তাদের এ সম্পর্ক কোন দিকে গড়াতে পারে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: জামায়াতে ইসলামী যে ইফতার পার্টি দিয়েছিল, তাতে আমি গিয়েছিলাম। সেখানে দলটির আমির যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে ইঙ্গিত মেলে, তারা মিলেমিশেই রাজনীতি করবেন। গণতন্ত্র বিনির্মাণে মনোযোগ দেবেন। তবে এ ধরনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য থাকে লিখিত। সাধারণত সুন্দর সুন্দর কথা বলা হয়। কিন্তু জামায়াত নেতাদের মাঠের বক্তব্যে এর প্রতিফলন নেই। আমার তো ১২ ফেব্রুয়ারিই মনে হচ্ছিল, ওরা পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়াবে। সংসদে মুখোমুখি মানে তো আর হাতাহাতি নয়। রাস্তায় তাদের পারস্পরিক অবস্থান শান্তিপূর্ণ নাও থাকতে পারে। আমি মনে করি, জামায়াত এখনই সংঘাতের দিকে যাবে না। দলটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। সংসদে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের আসনে বসেছে। এ বিজয়কে সংহত করে সামনে হয়তো আরও ভালো করার চেষ্টা করবে; ক্ষমতায়ও যেতে চাইবে তারা। তবে এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে শান্তিপূর্ণ পট পরিবর্তনের কোনো ইতিহাস নেই।
সমকাল: নির্বাচনের পর কি তারেক রহমান বা বিএনপির কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতার সঙ্গে দেখা বা কথা হয়েছে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: না, শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটা অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক কোনো কথা হয়নি, ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে।
সমকাল: আপনার মতে, সামনের দিনে রাজনীতি কেমন হতে পারে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: সেটা এখনও একটু ধূসর। তবে আমি এখনই বিএনপির ওপর হতাশ নই। আশাবাদী বলতে পারেন। দু-একটা ছোটখাট যে ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সংশোধনও হতে পারে যদি বিএনপি বুঝতে পারে। আর জামায়াত বিরোধী দলে থেকে যে ধরনের তীক্ষ্ণতা নিয়ে রাজনীতি করা দরকার, তা করবে বলে মনে করছি না। জন্মের পর থেকে আজ অবধি এ দলটা গণআন্দোলনের দল বলে ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে ফোকাস তারা পেয়েছে, ততটা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করি না আমি। এমনকি গণতন্ত্র মঞ্চের চেয়েও কম ভূমিকা সে আন্দোলনে তাদের।
সমকাল: পুরোনো জোট গণতন্ত্র মঞ্চের পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে?
মাহমুদুর রহমান মান্না: না, গণতন্ত্র মঞ্চ তো এখন নেই। তবে গণতন্ত্র মঞ্চ নিয়ে যদি ভাবতে হয় তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি উপস্থাপন করেই তা করতে হবে। সরকার যখন পারফর্ম করতে পারছে না, তখন আপনি সরকারেও থাকবেন আবার বিরোধী দলেও থাকবেন, তা তো হয় না। তবে এটা বলার সময় এখনও আসেনি।
সমকাল: আপনি কী করবেন?
মাহমুদুর রহমান মান্না: অন্তত সংসদের একটা অধিবেশন তো দেখতে হবে। তাহলে হয়তো পরিস্থিতি একটা নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করবে। সেটাও আবার জামায়াতের ওপর নির্ভর করবে। ওরা ১১ দল বানিয়েছে, কিন্তু সবাই নিজের মতো করে চলছে।
সমকাল: ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার জন্য শুভ কামনা।
মাহমুদুর রহমান মান্না: সমকালের জন্যও শুভ কামনা।
- বিষয় :
- সংসদ নির্বাচন
