ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষক লাঞ্ছনা বন্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ কী?

শিক্ষক লাঞ্ছনা বন্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ কী?
×
×

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী ৬ ডিনের পদত্যাগের দাবিতে প্রশাসনিক ভবনের সব কার্যালয়ে তালা দেন একদল শিক্ষার্থী।

মো. মাহবুবুর রহমান

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৫৩ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৫৯

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকের নিরাপত্তাহীনতা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের ভিত্তি ও আইনগত কাঠামোর ওপর চরম আঘাত। শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না, তারা একটি জাতির নৈতিক স্তম্ভ গড়ে তোলেন। ফলে শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া মানেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সেই দুর্বলতার লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের প্রকাশ্য হেনস্তা ও আগ্রাসী আচরণের শিকার হতে হচ্ছে। গত ডিসেম্বর ২০২৫-এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিনকে যেভাবে দপ্তরে তালাবদ্ধ করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতির পরিপন্থি। অথচ তাদের মেয়াদ শেষ হতে মাত্র কয়েক দিন বাকি ছিল।

একইভাবে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে প্রকাশ্যে ধাওয়া ও হেনস্তা করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি গাড়ি পর্যন্ত গিয়েও তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা চলে। সর্বশেষ জানুয়ারি ২০২৬-এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষককে হেনস্তা করে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন তল্লাশি করা হয়েছে। এটি কেবল অভদ্রতা নয়, বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব ঘটলেও তাদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল নির্বিকার।

চব্বিশের ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর থেকেই দেশের মাধ্যমিক থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এক ধরনের ‘মব জাস্টিস’ বা গণবিচারের সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলগত চাপের মুখে শিক্ষকদের শাস্তি বা পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রশ্ন ওঠে, ক্যাম্পাসে আদৌ আইনের শাসন কার্যকর আছে কি না। এসব ঘটনা অনেককে বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের বেআইনি রাষ্ট্রীয় তৎপরতার ভয়াল স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান কখনোই বিশৃঙ্খলা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ অনিরাপদ হয়ে ওঠে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক ও আইনি পথ রয়েছে; সেই পথ এড়িয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই অস্থিরতার প্রভাব কেবল শিক্ষক সমাজেই সীমাবদ্ধ নয়, অভিভাবকদের মধ্যেও গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি করছে। উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল সংযম ও দায়িত্বশীলতার। নেতৃত্ব মানেই বলপ্রয়োগ নয়, বরং নিয়ম ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল যথার্থই বলেছিলেন, যে সমাজ শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজের অবক্ষয় অনিবার্য। আজ আমাদের বাস্তবতা সেই উক্তিরই এক নির্মম প্রতিফলন।

রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষাঙ্গনকে নিরাপদ ও জ্ঞানভিত্তিক করে তোলা। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালু করা এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করা কেবল একটি পেশার সম্মান নয়, এটি রাষ্ট্রের ভিত্তি সুরক্ষিত রাখার অপরিহার্য শর্ত। এই সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে পুরো জাতিকেই তার চরম মূল্য দিতে হবে।

মো. মাহবুবুর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ
[email protected]

আরও পড়ুন

×