অর্থনীতি
জ্বালানি নিরাপত্তা যখন অধিক জরুরি
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়ালেও এর পরদিন এটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার খবর মিলল। এর প্রধান কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কণ্ঠে দ্রুতই যুদ্ধ শেষ করে আনার ইঙ্গিতবাহী বক্তব্য। ইসরায়েলের অবস্থান অবশ্য জানা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল তো সম্মিলিতভাবে হামলা চালিয়েছিল ইরানে। অনেকে বলেন, ইসরায়েল- পরিকল্পিত যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন ট্রাম্প। সৌদি আরবের মতো কোনো কোনো দেশও তাঁকে রাজি করিয়েছিল বলে ধারণা। যাই হোক, ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে যুদ্ধে ‘সাফল্য’ দাবি করেছেন। এতেও ধারণা জন্মেছে, যুদ্ধটা বেশিদিন চালানো হবে না।
এদিকে ইরান বলছে, যুদ্ধ শেষের সময় নির্ধারণ করবে তারা। যুদ্ধে দেশটি বিপর্যস্ত হলেও ক্লান্ত হয়নি। শুরু থেকে তার ওপর রীতিমতো যুদ্ধাপরাধ হলেও অক্লান্তভাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে এবং শেষে নতুন নেতা নির্বাচন করে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যুদস্ত হয়নি। এই নেতা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পুত্র। এটাও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য স্পষ্ট বার্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব তার পছন্দমতো হতে হবে। জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দখলে নেওয়ার ‘চিন্তাভাবনা’ও নাকি তিনি করছেন। এটি এখনও কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং যুদ্ধের এক পর্যায়ে প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়াতেই মূলত জ্বালানির দাম লাফিয়ে বেড়েছে।
খুব কম দেশই জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সিংহভাগ দেশকেই কমবেশি এটি আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভরতাও বিরাট। দেশের ভেতর থেকে কিছু প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোল আর অকটেন অবশ্য পেয়ে থাকি। বাকি পুরোটাই করতে হয় আমদানি। এ ক্ষেত্রে আমরাও হরমুজ প্রণালির ওপর কিছুটা নির্ভরশীল। সেখান দিয়ে সারসহ খাদ্যপণ্যও পরিবাহিত হয়। সেই প্রসঙ্গ অবশ্য চাপা পড়েছে জ্বালানি পরিবহনে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব সামনে আসায়। ইরান অবশ্য মাঝে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাদে সেখানে অন্যান্য নৌযানের ওপর আঘাত হানা হবে না। এতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল। স্বস্তি পুরোপুরি মিলবে বিপর্যয়কর এ যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হলে। হরমুজ প্রণালিও তখন সম্পূর্ণ মুক্ত হবে। উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের মতো ইরানের জ্বালানি রপ্তানির জন্যও এটি চালু রাখা জরুরি।
ইরানের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে আমরাও সংকটে পড়েছি। নতুন সরকারকে এখানে দায়িত্ব নিয়েই জরুরি জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নেমে পড়তে হয়েছে। বিদ্যুৎসহ জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জ্বালানি দ্রুত ফুরিয়ে যাবে– এমন শঙ্কায় ফিলিং স্টেশনে দেখা দিয়েছে অরাজকতা। জ্বালানি প্রশাসনেরও দায় রয়েছে এতে। সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে যথাযথভাবে তথ্য জোগানো হয়নি বোধ হয়। আমাদের জ্বালানি মজুত তো কখনোই সন্তোষজনক নয়। এটা বড় জোর ‘কাজ চালানোর উপযোগী’। আপৎকালীন মজুত নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কার খবর রাষ্ট্র হয়ে গেলেও আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা রোধ করা কঠিন। সমস্যাটা সেখানে।

পেট্রোল বা অকটেন নিয়ে দুশ্চিন্তা আসলে নেই। দুশ্চিন্তা বহুলভাবে ব্যবহৃত ডিজেল ঘিরে। এলএনজি নিয়েও দুশ্চিন্তা কম নয়। গ্যাস খাতে এলএনজি-নির্ভরতা বাড়ছে ক্রমে। গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরির কারণেও এলএনজি সংকট দেখা দিলে করতে হয় ‘রেশনিং’। এরই মধ্যে অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে। এমনটা আগেও করা হয়েছে। তবে ভরা বোরো মৌসুমে এ কারণে ইউরিয়া সারের সংকট হয় কিনা, সেটা বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। সরকার অবশ্য এর পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলছে। অন্যান্য সারের সঙ্গে কিছু ইউরিয়াও আমরা আমদানি করি গ্যাসের অভাবে সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে ব্যর্থ বলে। জ্বালানিতে আমাদের সংকট এতটাই। এ অবস্থায় যুদ্ধে আরও অস্থিতিশীল ‘স্পট মার্কেট’ থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি আনতে হচ্ছে সরকারকে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদ্যমান অবস্থায় এলএনজির বাড়তি সরবরাহও নিশ্চিত রাখা প্রয়োজন। এ কারণেই কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিতে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর সরবরাহ তো বিঘ্নিত হলো যুদ্ধে আক্রান্ত ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায়। তার মানে, ওই ধরনের চুক্তিও জ্বালানি নিরাপত্তা জোগাচ্ছে না। দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর বিকল্প আসলে নেই। এতে ‘নিজস্ব সক্ষমতা’ বাড়ানোরও বিকল্প নেই। ভারত থেকে পাইপলাইনে ও জাহাজে ডিজেল আমদানির বন্দোবস্তও মাঝে ঝুঁকিতে পড়েছিল দুই দেশের অবনতিশীল সম্পর্কের কারণে। সেটা অবশ্য কাটতে শুরু করেছে। এ সংকটে আমরা সেখান থেকে অতিরিক্ত জ্বালানিও আনতে পারব। ভারতের জ্বালানি মজুত ভালো। হালে তারা রাশিয়া থেকেও জ্বালানি কিনতে পারবে বলে ছাড় দিয়েছেন যুদ্ধ শেষ করে আনতে চাওয়া ট্রাম্প।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর অবশ্য বিশ্বাস রাখা কঠিন। ইরানকে পরমাণু আলোচনায় ব্যস্ত রেখে তারা হঠাৎ আক্রমণ শুরু করেছিলেন। ইরান অবশ্য বরাবরই প্রস্তুত এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায়। যুদ্ধেও সমরাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে ইরান। নেতৃত্বে শূন্যতাও সৃষ্টি হতে দেয়নি। সদ্য গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও দেশটির সরকার যেভাবে দুই শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে লড়ছে, সেটা উদাহরণ হয়ে থাকবে। তবে এমন পরিস্থিতির প্রভাব বলয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে যাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নেই, তাদের পক্ষে জনজীবনে স্বাভাবিকতা বজায় রাখা কঠিন। যুদ্ধের মাত্র ১০ দিনেই যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিশেহারা হওয়ার মতো অবস্থা। এরও প্রভাব থাকে মূল্যস্ফীতিতে। শুধু জ্বালানি নয়; খাতুনগঞ্জে আমদানিকৃত পণ্যের বাজারে এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। রোজার মাসটায় পণ্যবাজার কিন্তু অশান্ত ছিল না। সামনে ঈদ কেমন কাটবে, সেটা নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা।
যুদ্ধ বন্ধ হোক বা না হোক; ঈদের ছুটিতে মানুষের যাতায়াত যেন বাড়তি সংকটে না পড়ে। ডিজেলসহ জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না বলে আশ্বস্ত করেছে সরকার। যুদ্ধ বন্ধ হলে শান্ত হয়ে আসা বাজারে এর প্রয়োজনও থাকবে না। বিশ্বে জ্বালানি উৎপাদনে ঘাটতি নেই। এর চাহিদাও বেশি ছিল না বলে বাজার শান্ত ছিল। এ অবস্থায় যুদ্ধের প্রভাবেই ৭০-৭৫ ডলারের ডিজেলের দাম ছাড়িয়ে যায় ১০০ ডলার। দীর্ঘস্থায়ী ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম কিন্তু আরও বেশি বেড়েছিল। তখনও দেশে এর ‘কৌশলগত মজুত’ গড়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। আশ্চর্যজনক, জ্বালানি পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর প্রচেষ্টাও আমরা নিইনি। সে কারণে আবার বাড়ছে অধিক দামে পরিশোধিত ডিজেল আমদানি। এটা অবশ্য আনা যাচ্ছে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে। এটুকু ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ আমাদের রয়েছে!
যুদ্ধ বেশি দিন চলবে না আসলে আক্রমণকারী ও তার মিত্রদের নিজস্ব সংকটের কারণে। তবে এমন পরিস্থিতি হয়তো আবারও সৃষ্টি হবে। আর সেটা মোকাবিলার সক্ষমতা থাকতে হবে আমাদের। সে জন্য সীমিত আর্থিক সামর্থ্যে যেটুকু জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন সম্ভব, সেদিকে এগোতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে মূল্যবান জনশক্তি খাতটিও বিপদগ্রস্ত হতো। অন্যায় এ যুদ্ধটা শিগগিরই বন্ধ হলে এদিক দিয়েও আমরা বেঁচে যাই।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
