অর্থনীতি
জ্বালানির বিকল্প উৎস সন্ধান করতে হবে
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ১২ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিল্পায়ন, কৃষির প্রবৃদ্ধি আর যান চলাচলের চাপে আমাদের জ্বালানি চাহিদা ইদানীং হয়েছে কয়েক গুণ এবং প্রতি বছর সেই চাহিদা বাড়ার পরিমাণ প্রায় ১২ শতাংশ। ডিজেল (কেরোসিনের চাহিদা কমছে), ফার্নেস অয়েল, লুব্রিক্যান্ট, এভিয়েশন ফুয়েল আর পেট্রোল-অকটেনের সঙ্গে এখন এলপিজি, এলএনজির চাহিদাও বেড়েছে। কয়লাসহ জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বা মোট আমদানি ব্যয়ের প্রায় ১৭ শতাংশ, যার মধ্যে শুধু তরল জ্বালানি আমদানিতেই আমাদের ব্যয় হয় প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার।
আমরা মোট জ্বালানি চাহিদার ৬২ শতাংশ আমদানি করি। আমাদের ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন ক্ষমতা যেহেতু কম, তাই তরল জ্বালানি আমদানির বেশির ভাগই পরিশোধিত। তারও বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে। এলএনজি, এলপিজি আসে ওমান ও কাতার থেকে। সাম্প্রতিককালে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন এমনকি মিসর, ইন্দোনেশিয়া, ভারত আর চীন থেকেও আমরা জ্বালানি তেল বিশেষত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল এনেছি। সৌদি আরামকো, এডনক আবুধাবি, কুয়েত পেট্রোলিয়াম, পেট্রোনাস মালয়েশিয়া, এক্সন-মবিল সিঙ্গাপুর আমাদের কাছে পরিচিত নাম। ইদানীং আমরা কাতারের গ্যাস ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনছি এবং আরও আনার পরিকল্পনা রয়েছে। আগের আমলে আমরা আপৎকালে ভারত থেকে জরুরি ডিজেল এনেছিলাম। এমনকি তেল এনেছি মাইডর ইজিপ্ট আর ফিলিপাইনের ন্যাশনাল অয়েল থেকে।
আমাদের তেল আমদানির ক্ষেত্রে অন্য দেশের মতো ফিউচার মার্কেটে অপারেট করার অনুমোদন নেই। তাই আমরা তেলের নিম্ন বাজারদরের সুযোগ নিতে পারি না। এ দেশে বেশির ভাগ তেল আমদানির অর্থায়ন হয় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাংক আর সরকারি কোষাগার থেকে। এতে আমরা যেমন ৩০-৪০ ডলারে প্রতি ব্যারেল তেল আমদানি করতে পেরেছি, তেমনি ১৪০ ডলারেও আমদানি করতে হয়েছে। এলএনজি আর এলপিজির বাজার আরও বেশি টালমাটাল হয়ে থাকে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম সোমবার পর্যন্ত বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৮ ডলার ছাড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গেল রোববার চলে গেছে ১১০ ডলারের ওপরে। আশঙ্কা রয়েছে যুদ্ধ চলতে থাকলে এটি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত উচ্চ জ্বালানি মূল্যের মুখোমুখি হতে পারে; এমনকি যদি এক সপ্তাহের এই সংঘাত দ্রুত শেষও হয়ে যায়। কারণ এরই মধ্যে ইরান, কাতার, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের তেলক্ষেত্র বা রিফাইনারি আক্রান্ত হওয়া, সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত ও বিঘ্নিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, ব্যাহত লজিস্টিকস এবং জাহাজ চলাচলের বাড়তি ঝুঁকির কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অনেকেই বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং শিপিং রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা ‘বিশ্বের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে’। প্রায় সব পত্রিকাই বলছে, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত আগামী কয়েক সপ্তাহ চললে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলারে পৌঁছতে পারে। তাদের মতে, ‘যদি এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্বব্যাপী জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রত্যেকের জন্য জ্বালানি খরচ বেড়ে যাবে; পণ্যের ঘাটতি দেখা দেবে এবং কারখানাগুলো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় একটি চেইন রি-অ্যাকশন বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে।’
এক গবেষণা নোটে জেপি মরগ্যান চেজ ব্যাংকের বিশ্লেষকরা বলেন, বাজার এখন কেবল ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিতে নেই, সেই সঙ্গে অপারেশনাল বা সাপ্লাই চেইন বিঘ্নের মুখোমুখি হচ্ছে। কারণ রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রপ্তানি সীমাবদ্ধতা তেলের প্রক্রিয়াকরণ ও আঞ্চলিক সরবরাহ প্রবাহকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ স্থগিত হয়েছে। কারণ তেহরান তার উপকূল ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের বড় তেল উৎপাদক দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও কুয়েত তাদের তেল পরিবহন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী রিফাইনারিগুলোর জন্য প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এই বিপুল তেল বৈশ্বিক চাহিদার ১.৪ দিনের সমান।
বিশ্লেষকদের মতে, শিপিং বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক তেলক্ষেত্র বন্ধ হয়ে গেলে সেগুলোকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে শুধু যাতায়াত খরচ নয়; শিল্পোৎপাদন, খাদ্যদ্রব্য এবং আমদানি করা পণ্যের দামও ব্যাপক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শিল্পোৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শুরুতেই বলেছি, বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানি করে প্রায় ৭০ ভাগই আনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যদিও ইদানীং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এমনকি চীন ও ভারত থেকেও আমদানি হয়েছে। জ্বালানির বর্তমান রিজার্ভ আর পাইপলাইন বিবেচনায় আমাদের ত্বরিত ভারত, চীন, মালয়েশিয়া এমনকি ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আমদানির বিকল্প পথ নিতে হবে। এলএনজির জন্য ভরসা করতে হবে যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ভিয়েতনামের ওপরেও। ইতোমধ্যে সরকার ভারতের কাছে ডিজেল চেয়েছে এবং বিষয়টি ইতিবাচক দিকে অগ্রসরও হয়েছে। জ্বালানি, পররাষ্ট্র, অর্থ মন্ত্রণালয় ও ক্ষেত্রবিশেষে কারগিলের মতো আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে তেল ও জ্বালানি আমদানির পথকে মসৃণ করতে হবে।
বাংলাদেশে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, দুটি বিদেশি ব্যাংক আর দুটি স্থানীয় ব্যাংক বিপিসি আর পেট্রোবাংলার এলসি খোলে ও আমদানিতে সহায়তা প্রদান করে। তারা নিজেরা বিদেশি মুদ্রায় তারল্য সংস্থান না করতে পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শক্তি জোগাতে হবে। মধ্য মেয়াদে বিকল্প জ্বালানি সঞ্চালনের বিকল্প নেই।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ
