ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীনতার দিবস

৭ মার্চের ভাষণে নিষেধাজ্ঞা আছে?

৭ মার্চের ভাষণে নিষেধাজ্ঞা আছে?
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচনে সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়লাভ করা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন‍্যতম দাবিদার দল বিএনপি সরকার গঠন করলেও ৭ মার্চ নিয়ে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি পালন করেনি; দলীয়ভাবেও নিশ্চুপ ছিল। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ৭ মার্চের জাতীয় দিবসের স্বীকৃতি বাতিল হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। সে সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেটি এখনও বলবৎ। তবে সেই নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ৭ মার্চ জাতীয় দিবস বাতিলের কী সম্পর্ক? এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা উচিত, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের দেওয়া ভাষণ বাজানো বা শোনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা ছিল না এবং এখনও নেই। 

তাহলে ২০২৬ সালের ৭ মার্চে এই ভাষণ বাজানো এবং শোনা নিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলো কেন? এর পাশাপাশি সতর্ক পাহারা দিয়ে রাখা হয়েছে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। সেই বাড়িতে ফুল দিতে যাওয়ার পথে চারজনকে পুলিশ আটক করেছে এবং পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোর সময় একজনকে আটক করে শাহবাগ থানার পুলিশ। সেই আটকের প্রতিবাদে রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নিয়ে আবার ভাষণ বাজানো কর্মসূচি ঘোষণা করেন ডাকসু নির্বাচনে বাম একটি প‍্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ তিনজন। তারা মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর সময় ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের, মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ, এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসিরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল তাতে বাধা দেয় এবং জোর করে থানায় নিয়ে যায়। পরদিন তাদের তিনজনকে ‍সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শাহবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। এমনকি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ৭ মার্চের ভাষণ পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে নানাভাবে নিপীড়ন ও মারধর করা হয়েছে। শুধু নির্যাতনই শেষ নয়; তাকে শেষ পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে শাহবাগ থানায়। কেন? ৭ মার্চের ভাষণ শোনা কিংবা বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা না থাকলে কেন এই ভাষণ বাজানো, শোনা কিংবা ফেসবুকে পোস্টের অপরাধে বিভিন্নজনের বিরুদ্ধে মব সন্ত্রাস করা হবে? তাদের নির্যাতন ও গ্রেপ্তার করা হবে?
৭ মার্চ সম্পর্কে বই কিংবা পত্রিকা থেকে জানার আগেই আমি শুনেছিলাম আমার মায়ের স্মৃতি। ৭ মার্চ ১৯৭১, রেসকোর্স ময়দানে অনেকের সঙ্গে পেটে সন্তান নিয়ে আমার মাও উপস্থিত ছিলেন। সেদিনের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণের স্ফুলিঙ্গ এত বেশি তেজদীপ্ত ছিল যে, মা অনেকদিন পর্যন্ত বলতেন আমাদের। মা বলতেন, ৭ মার্চ না থাকলে বাংলাদেশ নামক দেশটিই হতো না। এ দেশের মানুষের স্মৃতির সবচেয়ে বড় উচ্চারণ– ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই ভাষণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনেকটাই ভূমিকা রেখেছিল। 

৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বস্বীকৃতি পেয়ে ইউনেস্কোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। পরে সেটি শিক্ষার্থীদের জানার জন‍্য পাঠ‍্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য জানুয়ারি মাসে যে বই বিতরণ করা হয়, তা থেকে ভাষণটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনকালে বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর স্মারকগুলো ভেঙে ফেলা হয়। ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বর বাড়িটি আক্রান্ত হয় দফায় দফায়। এসব আক্রমণের প্রতিবাদ করলেই হয় ট‍্যাগ দেওয়া হয়েছে ‘আওয়ামী দোসর’ অথবা মুক্তিযুদ্ধের নামে ‘আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা’ বলে। 

মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন’; ৩২ নম্বর ভাঙার প্রতিবাদ করলেই ‘আওয়ামী পুনর্বাসন’; ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ আর কোনোটিই তাহলে এ দেশে থাকবে না। সবকিছুতেই ‘আওয়ামী জুজু’। এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে আওয়ামী লীগ বাদ দিয়ে লিখতে পারবেন? তাহলে আমরা আর মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণ করব না? কারণ ভয়– ‘আওয়ামী লীগ’ এসে পড়বে। তাহলে তো আর আপনাদের বাতলে দেওয়া দিবস ছাড়া কোনো দিবসই পালন বা স্মরণ করা যাবে না– সবটাতেই আওয়ামী লীগের ভয়। কেন এত ভয়? ইতিহাসের প্রাপ্য সম্মান সবাইকেই দিতে হবে।

৭ মার্চ গত দেড় বছর ‘কালো’ করে রাখা হয়েছিল। কারা করেছে, কেন করেছে– সবই জানা। তবে এবারের ৭ মার্চও অনেকটা কালো– ‘বাতিল’, ‘বন্ধ’। বিএনপি কেন অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুসরণ করছে? বিএনপি তো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার দাবিদার। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, যিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, খেতাব পেয়েছিলেন। তাহলে তাঁর দল বিএনপি এই দফায় ক্ষমতায় এসে কেন ৭ মার্চকে কেন্দ্র করে দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছে? মব সন্ত্রাস করে ইমিসহ তিন শিক্ষার্থীকে পুলিশে দেওয়া এবং পরে মামলা দেখিয়ে আটক করা কিংবা এই ভাষণ বাজানোর অপরাধে আরেক শিক্ষার্থীকে নিপীড়ন করে থানায় সোপর্দ করার মধ‍্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনের আগের বাণীগুলোর বিপরীতেই অবস্থান দেখা যাচ্ছে।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাবি বিশ্ববিদ‍্যালয় 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×