ক্ষমতার ভারসাম্য
রাষ্ট্রপতিকে অসম্মানের ‘সাংবিধানিক বৈধতা’ বন্ধ হোক
আহম্মদ ফয়েজ
আহম্মদ ফয়েজ
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের দেওয়া ভাষণ হয়েছে বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ। এর আগে বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে জনপরিসরে এত আলোচনা কমই হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ মূলত মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষেই প্রস্তুত হয় এবং রাষ্ট্রপতি তা পাঠ করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এখানে প্রায় আনুষ্ঠানিক।
এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য দেখা গেল এবার রাষ্ট্রপতির ভাষণে। যে রাজনৈতিক দল তাঁকে রাষ্ট্রপতি করেছে, সেই দলের সরকারের সময়কার শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে সংসদে বক্তব্য পাঠ করতে হয়েছে মো. সাহাবুদ্দিনকে। এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণের শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিসংবাদিত নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় অসামান্য নেতৃত্বের জন্য তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের পুরো রাজনৈতিক জীবন আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্রলীগ থেকে রাজনীতি শুরু করে চাকরিজীবনে দলীয় আনুগত্য বজায় রেখে অবসরের পর তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হন। শেখ হাসিনার আস্থায় তিনি রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন।
কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেই আজ তাঁর কণ্ঠে ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ভাষ্য শোনা যাচ্ছে। এখন সেই বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সঙ্গীই নিজের ভাষণে জিয়াউর রহমানকে অকপটে মেনে নিচ্ছেন স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে।
সংসদে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক পর্যায়ে এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সকলের সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। সহস্রাধিক শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে।’
এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রস্তুত বক্তব্যই পাঠ করেন। প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত বিবেক বা রাজনৈতিক অবস্থানের ভূমিকা কী?
কেউ বলতে পারেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে পদত্যাগ করতে পারতেন। স্পিকার নির্বাচনের পরপরই তিনি পদ ছাড়লে হয়তো এই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না। সে ক্ষেত্রে তাঁকে যেমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না, তেমনি সাংবিধানিক সংকটের মুখেও পড়তে হতো না। যদিও আমরা এমনিতে নানাবিধ সাংবিধানিক সংকটের মধ্যে আছি বেশ লম্বা সময় থেকেই। এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু অভ্যুত্থান-পরবর্তী নয়; তারও আগে থেকেই। যেমন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টতই শপথ ভঙ্গ করেও প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে আসীন থেকেছেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ২০১৮ সালে আন্দোলন ও সহিংসতার ঘটনায় বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিল করেছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা নিজের বক্তব্যে পরিষ্কারভাবে স্বীকার করেছিলেন, রাগের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘…আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া আইন অনুযায়ী সকলের প্রতি যথাবিহিত আচরণ করিব…’
রাষ্ট্রপতির প্রসঙ্গে ফেরা যাক। প্রশ্ন হলো, পদত্যাগ করলে কি তা সম্মানজনক হতো? আবার পদে বহাল থেকে এমন বক্তব্য পাঠেও কি মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়নি? এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর সহজ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবশ্য ভিন্ন উদাহরণও রয়েছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারী তিন জোটের অনুরোধে তৎকালীন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা।
১৯৯১ সালের সেই নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরল সমঝোতায় সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস হওয়ার পর উত্তরসূরি নির্বাচন করেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে ফিরে গিয়েছিলেন সাহাবুদ্দীন আহমদ।

এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি ‘জননিরাপত্তা আইন’ নামে একটি বিতর্কিত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ এনেছিলেন। সংসদীয় পদ্ধতিতে সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি অতি সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দীন আহমেদ নিরপেক্ষ ভূমিকার জন্য প্রশংসিত ছিলেন।
ন্যূনতম স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার নজির রাষ্ট্রপতিদের জন্য নতুন নয়। নিজের চিন্তা বা বিবেক সমর্থন করে না এমন কথা ও কর্মে তাদের প্রায়ই লিপ্ত হতে দেখা যায়। অথচ আমাদের সংবিধানে তৃতীয় ভাগে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা বিষয়ে ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন কি চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন? তিনি কি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না?
নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির দেওয়া রূপরেখায় তিন নম্বর দফায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সুসমন্বয় করা হবে।’
অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের ভিত্তিতে এবং গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩)-এর সংশোধনীর প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে জুলাই সনদের এই প্রস্তাবের কিছু ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে বিএনপিসহ ৯টি রাজনৈতিক দল ও জোটের।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির অন্য প্রায় সব দায়িত্বই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করতে হয়।
ফলে প্রশ্ন থাকে, রাষ্ট্রপতি কি কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনকারী একটি পদাধিকারী হিসেবেই থাকবেন?
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটি যদি বারবার এমন পরিস্থিতিতে পড়ে, যেখানে তাঁকে বিব্রতকর বা অসম্মানজনক অবস্থায় দেখা যায়, তবে তা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার জন্যও সুখকর নয়।
রাষ্ট্রপতির পদকে বাস্তবিক অর্থে মর্যাদাপূর্ণ করতে হলে ক্ষমতার ন্যূনতম ভারসাম্য প্রয়োজন। নইলে রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি, কিন্তু কার্যত সীমাহীন নির্ভরতার দৃশ্য আবারও দেখতে হতে পারে। যে কোনো বিবেচনাতেই এ অবস্থার অবসান জরুরি।
আহম্মদ ফয়েজ: সাংবাদিক
- বিষয় :
- ক্ষমতা
