এবারের ঈদ স্রেফ চিরাচরিত আনন্দ ছিল না
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২৬ | ০১:০৬ | আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ | ০১:০৭
কক্সবাজারে এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপন আমার জন্য এক ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা। সমুদ্রপাড়ের শহরটি বরাবরই উৎসবমুখর থাকে, কিন্তু এবার সেই পরিচিত আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক নতুন উপলব্ধি— গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তরুণদের পরিবর্তিত মনোভাব ও রাজনৈতিক সচেতনতা।
গত শনিবারের দিনটি শুরু হয় ঈদের নামাজ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়া বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর মধ্যে যে আনন্দ, তা ছিল অচিন্তনীয়। সামাজিকমাধ্যমের যুগে আমরা যতই ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত থাকিনা কেন, সরাসরি সাক্ষাতের উষ্ণতা এখনও অনন্য। কুশল বিনিময়, হাসি-আড্ডা, শৈশবের স্মৃতিচারণ—সব মিলিয়ে ঈদের সেই চিরচেনা আবহ এবারও হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
তবে এবারের ঈদের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে বিভিন্ন আড্ডা ও আলোচনায় অংশ নেওয়া। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্পষ্টভাবে অনুভব করেছি, রাজনৈতিক সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। দেশের অর্থনীতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন, নীতিনির্ধারণ—এসব বিষয়ে তারা আগ্রহী এবং নিজেদের মতামত স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়েছে—তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের মাত্রা তুলনামূলক কমে এসেছে। অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলত; বন্ধুত্ব কিংবা সামাজিক সম্পর্কেও বিভাজন তৈরি করত। কিন্তু এখন অনেক তরুণই মতের ভিন্নতাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে। তারা বিতর্ক করছে, মতবিনিময় করছে, কিন্তু সেই ভিন্নতা সম্পর্কের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। এই সহনশীলতা একটি পরিণত সমাজের লক্ষণ।
এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে বলে মনে হয়। প্রথমত, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং তরুণদের ওপর গণঅভ্যুত্থানের জোরালো প্রভাব। দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে বাস্তবতাবোধ তৈরি করেছে, যা আবেগপ্রবণ বিভাজনের পরিবর্তে যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে উৎসাহিত করছে। এতে সমাজের মধ্যে তরুণদের একটা রাজনৈতিক বলয় গড়ে উঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তবে এই ইতিবাচক প্রবণতা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। তরুণদের এই আগ্রহ ও সচেতনতাকে গঠনমূলক পথে পরিচালিত করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কক্সবাজারে এবারের ঈদ শুধু আনন্দের উৎসবই ছিল না, বরং একটি আশার বার্তাও বয়ে এনেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা এবং তরুণদের মধ্যে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি—এই দুইয়ের সম্মিলন ভবিষ্যতের জন্য এক ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে একটি আরও সহনশীল, সচেতন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।
ইফতেখারুল ইসলাম: সহ-সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- ঈদুল ফিতর
- ইফতেখারুল ইসলাম
