ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

বিনিয়োগের জন্য সুদহার যৌক্তিকীকরণ দরকার

বিনিয়োগের জন্য সুদহার যৌক্তিকীকরণ দরকার
×

মামুন রশীদ

মামুন রশীদ

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

একজন বলছিলেন, নতুন সরকারের আমলে তিনি পুঁজিবাজারে অনেক চাঞ্চল্য আশা করছেন। তাঁর আশাবাদ হয়তো ঠিকই আছে। গেল অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা সংস্কারের অনেক কথা শুনলেও  পুঁজিবাজারে তেমন কর্মকাণ্ড দেখিনি। কোনো আইপিও আসেনি; বাজার মূলধনের পতন ঘটেছে; সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আশাহত। তবে এটিও নির্জলা সত্য, উচ্চ সুদহার ব্যবস্থায় পুঁজিবাজারে চাঞ্চল্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হ্রাস পায় বাংলাদেশের মতো বিকাশমান দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারল্য প্রবাহ। তাই হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কর্তাব্যক্তি এসেই ঋণের সুদহার হ্রাস আর বন্ধ কলকারখানা খুলে দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁকে সুদহার কমানোর চিন্তা আপাতত ভুলে যাওয়ার কথাই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। এক-দুজন অবশ্য সরাসরি বলেছেন। অনেকে অনেক দিন ধরে এই কথাও বলছেন, উচ্চ সুদহার ঋণখেলাপি সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে।

বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বছরগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে ৩৩ থেকে কখনও কখনও ১০০ ভাগ। আবার চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সৌদি আরব, ভারতের মতো দেশে ঋণের সুদহার ২০২৩ সালের পর থেকে ওঠানামা করছে ২ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে। অনেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় শুরুতে সুদের হার বাড়ালেও দ্রুতই আবার কমিয়ে এনেছেন এবং এতে কাজও হয়েছে।

অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ২০২৪ সাল থেকে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির রাখার ফলে বাংলাদেশে ব্যাংকে ঋণের সুদ বেড়েছে ১৬ শতাংশ বা তারও বেশি। বেড়েছে ব্যবসা পরিচালন ব্যয়।
আগেই বলেছি, বিনিয়োগের মন্থরতা দূর করে নতুন সরকারের এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরিতে সুদহারের শিথিলতা বা যৌক্তিকীকরণের উপায় খুঁজছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের খোদ মুখপাত্রই বলেছেন, সব মেনে ব্যবসা করতে গেলে ১৫ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া সুকঠিন। তার ওপর ১৫ শতাংশ যদি সুদ দিতে হয়, তাহলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকা দুষ্কর। আবার তারল্য সংকটে থাকা যেসব ব্যাংক রয়েছে, তারা আমানতের বিপরীতে সুদহার কমিয়ে ফেললে আমানত না পাওয়ার সার্বক্ষণিক ভয়ে আছে বা থাকে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর ন্যূনতম ১ শতাংশ করের বোঝা অনেক ব্যবসার টিকে থাকার পথই রুদ্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে অতি নামিদামি প্রতিষ্ঠানও ১ শতাংশ নিট মুনাফা অর্জন করতে পারে না।

আমরা জানি, রিজার্ভসহ কিছু সূচক ভালো অবস্থায় এগিয়ে থাকলেও মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও সরকারের লক্ষ্য আর অর্জনে বড় বাধা হবে খেলাপি ঋণ– তাতে সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠন কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যাংক ঋণ নিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেছেন। অনেকে ঋণের বৃহদাংশই পাচার করেছেন। দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন। অনেকেই ব্যাংকের টাকায় ক্ষতি অর্থায়ন করেছেন। এমনকি নিজের অনুপস্থিতিতে ঋণের টাকা কোথায় চলে গেছে, জানেন না। সবাই হয়তো এমনটা করেননি। কিন্তু কিছু মন্দ ব্যবসায়ীর জন্য পুরো শিল্প খাতই বেশ চ্যালেঞ্জে। ব্যাংকের নতুন ঋণ সক্ষমতা কমে গেছে। তাই মন্দ ঋণ আদায়ে খড়্গহস্ত না হয়ে শুধু সুদের হার কমিয়ে তারল্যে উন্নতি করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ সুদের হারের আমাদের মতো দেশে ‘সর্বরোগহর মলম’ হিসেবে কার্যকারিতার কথা না-ই বা বললাম। তবে ধেয়ে আসা মূল্যস্ফীতি ও বাজার সংকট বিবেচনায় ঋণের সুদহারের আকাঙ্ক্ষিত পর্যায়টি কী হবে, সেটি নিয়েও বিতর্ক থাকার কথা। আমি অবশ্য অনেকের কাছেই শুনেছি, ঋণের সুদহার ন্যূনতম ২-৩ শতাংশ কমাতে হবে। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মন্দ ঋণ আদায় করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নতুন ঋণের জন্য তারল্য বৃদ্ধি।

টেকসই বিনিয়োগ ধরে রাখতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা কার্যকর করতে, বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কাঠামোগত সংস্কার এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানিতে মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন অনেকে। এমনকি অপরাপর প্রতিযোগী বা সমপর্যায়ের দেশে এ ধরনের উদ্যোগ অনেকটাই কাজ করেছে। বাংলাদেশে যে কোনো উদ্যোগ নিতেই কেন যেন অনেক দেরি হয়ে যায়। এর ভুক্তভোগী হয় জনসাধারণ। এ জন্য আমরা গতানুগতিকভাবে আমলাতন্ত্রকে, নাকি নীতি-অবশ বা পলিসি প্যারালাইসিসকে দায়ী করব– তা জোরের সঙ্গে বলতে পারছি না। তবে এটা জানি, জোরে কাশতে না পারলে বা প্রচলিত আটপৌরে নীতি কাঠামোকে অনেক জোরে বা অভিনব উপায়ে ধাক্কা দিতে না পারলে সমস্যা কাটবে না। আমরা হয়তো শুধু ষাট বা সত্তর দশকের অর্থনীতি পাঠের অভিজ্ঞতায় গতানুগতিক কথাই বলে যাব। বাজারের উদ্ভূত বা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নতুন নতুন দাওয়াই না হলে রোগ সারাতে পারে না। ঘুরে তাকাতে হবে বাজার ব্যবস্থার অপরিপক্বতা বা অংশীজনের জবাবদিহির অভাবের দিকেও। রাজনৈতিক সুশাসন নিশ্চিতে অন্ধের মতো ব্যবহারকেও।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×