ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দৌলতদিয়ায় বাস ডু‌বি

দুর্ঘটনাই কি আমাদের নিয়তি!

দুর্ঘটনাই কি আমাদের নিয়তি!
×

দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে চল্লিশজনের মতো যাত্রী নিয়ে পদ্মায় একটি বাস ডুবে যায়

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৭:২৭ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৭:৩৩

ঈদুল ফিতরকে ঘিরে দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত। কিন্তু প্রতি বছরই সেই প্রত্যাশা বারবার ভেঙে যায় সড়ক দুর্ঘটনার নির্মম বাস্তবতায়। এবারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সরকারি হিসাবে সাত দিনে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯২টি এবং নিহতের সংখ্যা ১০০ জন, যদিও বেসরকারি সংস্থার হিসাবে দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৬৮ এবং নিহত ২০৪ জন। বুধবার সমকাল এ নিয়ে বিস্তারিত একটা প্রতিবেদন ছাপিয়েছে। বুধবারই আমরা দেখেছি, দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে চল্লিশজনের মতো যাত্রী নিয়ে পদ্মায় একটি বাস ডুবে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সেখানে ২৬ জনের প্রাণহানির খবর আমরা পেয়েছি। আরও অনেকে নিখোঁজ আছেন।

এই ছোট লেখার বিষয় সড়ক দূর্ঘটনা যে আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটাই তুলে ধরা। এই নির্মম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল না। বর্তমান সরকারেরও এ ব্যাপারে কার্যকরী কোনো পরিকল্পনা দেখছি না।  

বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারের কেউ কেউ স্মরণকালের নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রার দাবি করছে। বাস্তবতার সঙ্গে এই দাবির কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, নির্বিঘ্ন যাত্রা বলতে শুধু যানজটমুক্ত পথকে বোঝায় না; এর সঙ্গে মানুষের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যদি শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান, শত শত মানুষ আহত হন, তাহলে সেটিকে কীভাবে নির্বিঘ্ন বলা যায়?

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কারণগুলো নতুন কিছু নয়। বিগত সরকারগুলো বিচিত্র উদ্যোগ নিয়েছিল বটে, কিন্তু কোনোটাই আসলে সমস্যার সমাধান দেয়নি। অতিরিক্ত গতি, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অদক্ষ চালক এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা—সবই বহুবার চিহ্নিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এগুলো সমাধানে কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগের ঘাটতি। ঈদের আগে কিছুদিনের জন্য মোবাইল কোর্ট বা চেকপোস্ট বাড়ানো হয়, কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। ফলে দূর্ঘটনা এদেশে আমাদের প্রতিমূহূর্তের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা। ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক সড়কেই অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলো পরিকল্পিত নয়। পাশাপাশি, গণপরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা গ্রহণের প্রবণতাও দুর্ঘটনা বাড়ায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যতদিন না সড়ক নিরাপত্তাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হবে, ততদিন এই মৃত্যুমিছিল থামবে না। প্রতি ঈদেই আমরা একই ধরনের শোকবার্তা শুনব, আর পরের বছর আবার একই ঘটনা পুনরাবৃত্তি হবে।

প্রতিটি সরকার নতুন নতুন প্রকল্প হাতে নেয়, উড়াল সেতু, ফুট ওভার ব্রিজ কতকিছু করেছে, কিন্তু কোনোভাবে দূর্ঘটনা কমছে না। তাহলে এটি স্পষ্ট যে, আমাদের নীতিগ্রহণে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে একদিকে সময়ের অপচয়, অন্যদিকে টাকপয়সা আত্মসাৎ। এর চেয়ে নির্মম সত্য হল, প্রতি দিন কোনো না কোনো পরিবার ভাই, বোন কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়-স্বজন হারাচ্ছে। 

যে কোনো দূর্ঘটনা কমিয়ে আনতে ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সহজ ও কার্যকরী করতে পদক্ষেপ নেওয়া, বারবার শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন না এনে দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকরী নীতিগ্রহণ করা দরকার। কিন্তু সরকার যেভাবে আগাচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে, তারা বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান আন্তরিকভাবে চায় না, বরং বিভিন্ন প্রকল্প হাজির করে সমস্যা জিইয়ে রাখছেন। নিত্যপণ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিকিৎসা খরচ সাধ্যের মধ্যে রাখা ফ্যামিলি কার্ডের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। 

অতএব, এখন সময় এসেছে আত্মপ্রশংসার বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাস্তবতাকে স্বীকার করার। নির্বিঘ্ন ঈদযাত্রার স্লোগান নয়, প্রয়োজন নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার কার্যকর পদক্ষেপ। মানুষের জীবনকে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং প্রতিটি প্রাণহানিকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যার সমাধানমূলত নীতিগ্রহণ জরুরি। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 
 

আরও পড়ুন

×