ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ঈদের আনন্দে যখন বিষাদের ছায়া 

ঈদের আনন্দে যখন বিষাদের ছায়া 
×

হাসান মামুন 

হাসান মামুন 

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ | ১৬:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের ছুটিতে সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা নতুন নয়। এ সময়ে যাতায়াত বেশি হওয়ার সঙ্গে দুর্ঘটনাও বেশি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ঈদে হয়তো কিছুটা কমে; তবে সাধারণভাবে দুর্ঘটনা বাড়তেই দেখা যায়। এর কারণগুলো বহুল আলোচিত বটে। বিশেষত প্রধান কারণগুলো অজানা, এটা বলার সুযোগ নেই। ফলে প্রতিবারই দুর্ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হলে প্রশ্ন ওঠে– এটা নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ ছিল কিনা। নাকি গতানুগতিক তদন্ত আর বিধিবদ্ধ ক্ষতিপূরণের কথা বলেই দায় এড়ানো হবে?     

যারা সরকারে আছেন, তারা এর দায় এড়াতে পারবেন না। অবশ্য বলতে পারবেন, আমরা তো মাত্রই     দায়িত্ব নিয়েছি। রোজায় পণ্যবাজার সামলাতে     হয়েছে। এসেই আবার সামলাতে হচ্ছে ইরান যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। এরই মধ্যে ঈদ এসে গেছে। 

এসব বলা যাবে না এ কারণে যে, ঈদে যাত্রীর নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমলাতন্ত্রের একাংশ আলাদা করে নিয়োজিত। তাদের কাছ থেকে কাজ আদায়ের দায়িত্ব রয়েছে সরকারের। ব্যর্থ হলে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সেটা দৃশ্যমান হতে হবে জনতার সামনে, যাদের অনেকটা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই দেশময় চলাচল করতে হয়। ঈদের ছুটিতে ঝুঁকিটা দ্বিগুণ-তিন গুণ হয়ে যায় হয়তো। দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যায় এর কিছুটা প্রতিফলন মেলে। 

নিবন্ধটি লেখার দিনও ভোরবেলায় চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের পাওয়ার কারে আগুন লেগে তা ছড়িয়ে পড়ে লাগোয়া বগিতে। ঘটনাটি সময়মতো ধরা পড়ায় ট্রেন থামানো সম্ভব হয় এবং নেমে যেতে সক্ষম হন যাত্রীরা। নইলে কী ঘটত, কল্পনা করতেও ভয় লাগে। পাওয়ার কারে আগুন লাগা স্বাভাবিক কিনা, সেটা অবশ্য সংশ্লিষ্টরাই বলতে পারবেন। 

ঈদের ছুটিতে আরেকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে কুমিল্লায়, যাতে ১২ বাসযাত্রীর মৃত্যু ঘটেছে। রেলক্রসিং খোলা পেয়ে তাতে বাস উঠে আসায় একটি মেইল ট্রেনের সঙ্গে ঘটে সংঘর্ষ। ট্রেন দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি নিয়ে অনেকটা পথ যাওয়ার পর থামে। এতে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারত। ওই ঘটনায় গেটম্যান ও ‘অস্থায়ী’ গেটম্যানের দায়িত্বহীনতা খোঁজা হচ্ছে। চলছে গ্রেপ্তার। তবে এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। দায়িত্বহীনতা রয়েছে আসলে রেল ও সড়কপথের সংযোগস্থল তথা রেলক্রসিং ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই। 

সনাতনী ধারার কাজের সংস্কৃতিতেও অবনতি ঘটছে। বেড়েছে দায়িত্বহীনতা। সান্তাহারে সিগন্যাল অমান্য করে ট্রেন চালিয়ে লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা এর প্রমাণ। অন্যান্য ট্রেনের চালক নাকি রেললাইন মেরামতের সতর্কসংকেত মেনে ধীরে এলাকাটি অতিক্রম করেছেন। 

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটির ছাদে আবার ছিলেন অনেক যাত্রী। নিষিদ্ধ হলেও বিশেষত ঈদের ছুটিতে ছাদে উঠে বসা কখনোই রোধ করা যায় না। ট্রেন, বাস, নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী বহনও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মাঝে একবার সম্ভবত সেনা কর্তৃপক্ষের কঠোরতায় ছাদে বসে যাওয়া আর অতিরিক্ত যাত্রী বহন নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছিল। অনেকেই সেবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি যেতে পারেননি। 
বাস, ট্রেন, নৌযান মিলিয়ে আমাদের যাত্রী বহন ক্ষমতা তো চট করে বাড়ানো যায় না; চাহিদা যদিও হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। এ অবস্থায় বিশেষত বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেওয়া সহজ হয় না। রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেও তেমন নির্দেশনা দেওয়া কঠিন। 

ঈদে এবার দীর্ঘ ছুটি দেওয়া হয়েছিল, যাতে বিভিন্ন খাতের মানুষ ধাপে ধাপে গন্তব্যে যেতে পারে। বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যেই কিছুটা স্বস্তি ও নিরাপদে। সেটা কোনো ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা গেছে; কোনো ক্ষেত্রে যায়নি। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতাও শেষতক রোধ করা যায়নি। ঈদে অতিরিক্ত অর্থ আদায় যাত্রীরা মেনে নিতে অবশ্য অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সমস্যা হলো, অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও মোটামুটি ঝুঁকিমুক্ত সেবা তারা পাচ্ছেন না। স্বস্তির দাবি না হয় পাশে সরিয়ে রাখা হলো। 

ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফেরার পথে দৌলতদিয়া ঘাটে যেভাবে যাত্রীবোঝাই বাস তলিয়ে গেল পদ্মায়; সেটিকে কী বলা যাবে? ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীদের তো নেমে যাওয়ার কথা। নামতে না চাইলে নামিয়ে দেওয়াই বিধান। এক সময় এসব নিয়ম-বিধি কিন্তু মান্য করা হতো। ইতোমধ্যে সব দিক থেকেই বেড়েছে উদাসীনতা। এর পরিণতি যে কত ভয়ংকর হতে পারে, দৌলতদিয়ার ঘটনা তার প্রমাণ। 
পন্টুন থেকে বাসটির ছিটকে পড়া ঠেকানো যায়নি কেন– সে প্রশ্ন উঠবে। হয়তো দেখা যাবে, বাসটি মহাসড়কে চলাচলের উপযুক্তই ছিল না। দেখতে-শুনতে আকর্ষণীয় হলেও এর ভেতরটা হয়তো ‘আনফিট’। হতে পারে, আনফিট ছিলেন চালক। হতে পারে, ‘হেলপার’ তখন বাসটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। 

একগুচ্ছ কারণও অনেক সময় দুর্ঘটনাকে অনিবার্য করে তোলে। তখন আর সেটিকে দুর্ঘটনা বলা চলে না। কিছু দুর্ঘটনাকে তাই ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে বর্ণনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এগুলো ‘কাঠামোবদ্ধ হত্যাকাণ্ড’। আনফিট বাস বা নৌযান কেন ব্যবসা করতে নামবে– এটা মৌলিক প্রশ্ন। কেন অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেওয়া হবে? চালকের ফিটনেস থাকলেও তিনি যথেষ্ট বিশ্রাম না নিয়ে কেন  কাজ করবেন? এসব কারণ একত্র হলে কে ঠেকাবে দুর্ঘটনা? 

আর এসব দুর্ঘটনায় যারা আহত হন, তাদের ক’জনেরই বা হয় ধারাবাহিক সুচিকিৎসা? অঙ্গহানি হলে সে ক্ষেত্রে কী ঘটে ওই পরিবারে? গত ১০ বছরে দুর্ঘটনায় যারা পঙ্গু হয়েছেন, তাদের মানসম্মত তথ্যানুসন্ধানও কি হয়েছে? তাদের মধ্যে কতজন একমাত্র উপার্জনক্ষম? হতাহতদের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক যে ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষিত হয়, তা পাওয়ার প্রক্রিয়াও কি সহজ? 

দাবি করে বলা যাবে, সড়ক অবকাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তা বেড়েছে কতটা? নৌ আর রেলপথে আবার চিত্রটা ভিন্ন। যানের ভেতর সেবার মান হয়তো বেড়েছে, কিন্তু পথ অনিরাপদ এখনও। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যাতায়াত সহজ হয়েছে। বিশেষত চাপ কমেছে নৌপথে। দুর্ঘটনাও কমেছে। তবে মনিটরিং কমে এলে তা বাড়তে পারে। 
ঈদের ছুটিতে যাত্রী নিরাপত্তা বাড়াতে একেবারে নতুন কিছু করার প্রয়োজন অবশ্য কম। প্রয়োজন ইতোমধ্যে আলোচিত করণীয়গুলোয় জোর দেওয়া। কোরবানির ঈদ আসতে বেশি দেরি নেই। সেই ঈদেও কম দুর্ঘটনা ঘটে না। গ্রামের দিকে যাওয়ার প্রবণতা কোরবানির ঈদে আরও বাড়তে দেখা যায়। তখন দ্বিমুখী চলাচল অনেক বাড়ে। কোরবানির পশু নিয়ে অনেকে আসেন গ্রামাঞ্চল থেকে। কম খরচে, বেশি ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের প্রবণতা বাড়ে। সেই পর্ব আসতে আসতে নতুন সরকার পারে এবারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে। 

ঈদের ছুটিতে বেড়ে ওঠা চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে সরকার কিছু ‘বেদনাদায়ক সংস্কার’কর্মেও যেতে পারে; শাসনামলের শুরুর দিকে। তার সুফল পেলে জনগণ এর মূল্যায়ন করবে না, তা নয়। ভোগান্তি কমানো ও নিরাপত্তা বাড়ানোয় অংশীজনদের নিয়ে কিছু প্রচারণাও জোরদার করা যায়। যাতায়াতে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অগ্রাধিকার হতে হবে। ঈদের আনন্দ যেন বিষাদে পরিণত না হয়, সেটা ‘মিন’ করা গেলে জনগণ তাতে সাড়া দেবে না কেন? 

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×