তৃতীয় মেরু
‘হামার’ বলেন্দ্র যখন হিমালয়ে
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেপালের কাঠমান্ডুতে শুক্রবার শপথ নেওয়া নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির রাজধানী থেকে প্রায় সাড়ে চারশ কিলোমিটার দূরের ঝাপা-৫ সংসদীয় আসন থেকে; সেপ্টেম্বর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে হারিয়ে। আসনটি বাংলাদেশ থেকেও নিকটতম নেপালি এলাকাগুলোর একটি। নেপাল-ভারত সীমান্তরেখা মেচি নদী থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তরেখা মহানন্দা নদীর দূরত্ব মাত্র ২১-২২ কিলোমিটার। বস্তুত, নেপালের সর্বপূর্বের জেলা ঝাপা থেকে কাঠমান্ডু ও ঢাকা ভৌগোলিকভাবে প্রায় সমদূরত্বে অবস্থিত।
ভৌগোলিকভাবেই হিমালয়ের পাদদেশের যে সমতল ভূমি তরাই বা ডুয়ারস নামে পরিচিত, সেটা নেপালের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় ২২টি জেলা ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলীপুরদুয়ার, কোচবিহার, আসামের ধুবড়ি এবং বাংলাদেশের পঞ্চগড় পর্যন্ত বিস্তৃত। কোশি, মেচি, মহানন্দা, তিস্তা, রইডাক, ধরলা, দুধকুমার, সঙ্কোশ নদীবিধৌত।
কেবল ভৌগোলিক নৈকট্য নয়; ঝাপাসহ পার্শ্ববর্তী মোরাং, সুনশারি জেলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা থেকে নেপালের ঝাপা জেলার মাঝখানে
কেবল ভারতের শিলিগুড়ি। ষাটের দশকের শেষভাগে এই মহকুমারই নক্সালবাড়ী বিদ্রোহ যেমন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলকে প্রভাবিত করেছিল, তেমন নেপালেরও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ।
ভারত সরকারের বিদ্রোহবিরোধী অভিযান থেকে বাঁচতে চারু মজুমদার, কানু সান্যালের মতো নক্সালবাড়ী বিদ্রোহের নেতারা যেমন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন জেলায়, তেমনই নেপালের ঝাপা-মোরাং জেলায়ও আত্মগোপনে যেতেন। ভারতের নক্সালবাড়ী বিদ্রোহের মতো নেপালের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে ‘ঝাপা বিদ্রোহ’। খোদ কেপি শর্মা ওলি নক্সালবাড়ী বিদ্রোহের মন্ত্রে দিক্ষিত হয়েই মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কে জানে, খোঁজ করলে বাংলাদেশের সশস্ত্র বামপন্থিদেরও পদচিহ্ন মিলতে পারে সেখানে!
আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে যদি দেখি– ঝাপা, মোরাং প্রভৃতি জেলার উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী আসলে বাঙালি হিন্দু, বিশেষত কৃষক সম্প্রদায়। নেপালের এই জেলাগুলোর জনমিতিতে ‘বাংলা’ ভাষার কথা আলাদভাবে উল্লেখ করা নেই। কিন্তু যে ‘রাজবংশী’ ভাষার কথা বলা হয়, সেটা আসলে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের ভাষা।
মনে আছে, ২০১৪ সালে খাদ্য নিরাপত্তা-বিষয়ক এক সম্মেলনে কাঠমান্ডু গিয়ে ঝাপা জেলার কৃষক দর্শন মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সবার কথা শুনতে শুনতে তিনি দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে হাতের কালসিটে পড়া তালু দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘বাবু বুদ্ধিজীবীদের’ কথা শুনলে হবে না। ‘হামার’ মতো কৃষকের কথা শুনতে হবে। পরে যখন জানলেন আমার বাড়ি রংপুর অঞ্চলে; এক গাল হেসে বললেন ‘ও হামারে ওটকের!’
প্রসঙ্গত, ঝাপা বিদ্রোহে অংশ নিতে গিয়েই কেপি শর্মা ওলি জেলে গেছেন এবং ক্রমে বড় নেতা হয়ে উঠেছেন। যে কারণে তাঁর নিজের জন্মভূমি তেরাতুন জেলা হলেও রাজনীতি করে আসছেন এবং বারবার নির্বাচিত হয়ে এসেছেন ঝাপা জেলার বিভিন্ন আসন থেকে। এবার তিনি যে বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে নির্বাচনে হেরেছেন, তাঁর মাতৃ-পিতৃভূমিও তরাই অঞ্চল; পাশাপাশি অবস্থিত জেলা ধানুশা ও মাহোত্তারি। বলেন্দ্রর পিতা ও পেশায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক রামনারায়ণ শাহ কর্মোপলক্ষে কাঠমান্ডু থিতু হয়েছিলেন।
ধানুশা, মাহোত্তারিসহ নেপালের তরাই অঞ্চলের ২২টি জেলার মানুষকে ‘মাদেশি’ বলা হয়। কথাটি আসলে ‘মহাদেশী’ শব্দের অপভ্রংশ। আসলে ভারতীয় উপমহাদেশীয় সমতলের সংস্কৃতি বোঝানো হয়, যা নেপালের পার্বত্যাঞ্চলীয় ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও নৃতত্ত্ব থেকে আলাদা। তবে মাদেশিদের মধ্যেও ভাগ আছে– মৈথিলি, ভোজপুরি, রাজবংশী বা বাঙালি, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান প্রভৃতি। বলেন্দ্র শাহের মাতা-পিতা সাংস্কৃতিকভাবে মৈথিলি সম্প্রদায়ের।
ভাষা ও সাংস্কৃতিকভাবে মৈথিলিরা বাঙালির জ্ঞাতি জনগোষ্ঠী। আমরা যেমন প্রবাদে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ বলে থাকি, তেমন মৈথিলি ভাষায়ও আছে ‘মাছে ভাতে মিথিলা’। মাছ-ভাত, ডাল ছাড়াও তাদের অন্যান্য খাদ্যাভ্যাস আমাদের মতোই। আমার এক নেপালি মৈথিলি বন্ধু একবার কাঠমান্ডুতে বসে কথা প্রসঙ্গে প্রবাদ শুনিয়েছিলেন– ‘দৈ-চিড়া-খই/ মৈথিলি বিয়া হই’। এই তিন খাবার ছাড়া নাকি ‘বহুভাত’ হয় না।
খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির প্রশ্নে ধর্মীয় দিক থেকে খানিকটা পার্থক্য থাকলেও ভাষাগত দিক থেকে মৈথিলি, বাংলা ও অহমিয়া সহদোরা; একই মাগধি প্রাকৃত থেকে জন্ম নিয়েছে। গবেষকরা বলেন, এখনও ৬০-৭০ শতাংশ শব্দ অভিন্ন। গবেষকদের এই দাবির প্রমাণ পেয়েছি নেপালের এবারের নির্বাচনে।

যেমন, বলেন্দ্র শাহ তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন মাতৃভূমি ধানুশা জেলার জনকপুর শহর থেকে, গত ১৯ জানুয়ারি। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসমতে, জনপদটি রামায়ণ চরিত্র সীতা বা জানকীর জন্মস্থান; মিথিলার রাজা জনকের কন্যা। সেখানে বলেন্দ্র মৈথিলি ভাষায় তাঁর বক্তব্য শুরু করেছেন এভাবে– ‘সর্বপ্রথম মাতা জানকীকে প্রণাম। বিভিন্ন আন্দোলনমে জ্ঞাত্-অজ্ঞাত্ শহীদপর সম্মান ও সমবেদনা।... বিশ্বকে সবচে প্রসিদ্ধ বিবাহ্ রাম-জানকীকি বিবাহ্ এ স্থলমে হৈছে। লেকিন মাদেশি লোকসব ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করলি জয়পুর যাইছে’। ইউটিউব থেকে হুবহু তুলে দেওয়া এই ভাষাকে কি বাংলা বলে ভ্রম হয় না?
বলা বাহুল্য, ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক নৈকট্য যতই থাকুক, বলেন্দ্র শাহ যখন প্রতিবেশী ভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন মূল প্রশ্নটি অনিবার্যভাবেই কূটনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক।
খোদ বলেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে কাঠমান্ডুর মেয়র থাকাকালে নিজ দপ্তরে ‘বৃহত্তর নেপাল’ মানচিত্র স্থাপন করে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। ১৮১৬ সালে গুর্খা রাজা ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চুক্তির আগের ওই মানচিত্রে ভারত, এমনকি বাংলাদেশেরও সামান্য কিছু অংশ ছিল। মেয়র থাকাকালে তিনি কাঠমান্ডুর সিনেমা হলে ভারতীয় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে নেপালি উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও অগ্রাহ্য করেছিলেন। শুধু ভারত নয়; গণঅভ্যুত্থানের পর চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ‘তাঁবেদার’ আখ্যা দিয়ে সব নেপালি রাজনৈতিক দলের প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ‘মুখ খারাপ’ করেছিলেন। সেই তালিকায় তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিও ছিল।
এটাও মনে রাখতে হবে, গত বছরের গণঅভ্যুত্থান এবং এ বছরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নেপালের পুরোনো রাজনৈতিক পাটাতন সম্পূর্ণ বদল হয়েছে। ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ তাদের শুক্রবারের সম্পাদকীয়তে যথার্থই লিখেছে– “শেষ পর্যন্ত নেপালি রাজনীতির টেকটনিক প্লেট সরে গিয়েছে; এবং ঝাঁকুনি দিতে থাকা ‘ইয়ুথকুয়্যাক’ শেষ পর্যন্ত সিংহ দরবারের ফটকের গন্তব্যে এসে অটল হয়েছে।”
স্বীকার্য, নেপাল বরাবরই বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক খেলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষাভাবে বাংলাদেশের পাশেই থেকেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন,
এজমালি জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা, সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাধাহীন সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রভৃতি ক্ষেত্রে নেপাল বাংলাদেশের পাশেই ছিল।
এই বাস্তবতাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ যতখানি, ভারত ও চীন তার চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিকভাবে নেপাল-ঘনিষ্ঠ। আবার, এই দুই দেশের কাছে ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নে নেপালের কদরও বেশি। নেপাল ২০১৭ সাল থেকে যেমন চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ, তেমনই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রও নানা ‘উন্নয়ন’ প্যাকেজ দিয়ে আসছে। যেমন ২০২২ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কো-অপারেশন’ স্বাক্ষর করেছে। নেপালি বিশ্লেষকরা বলছেন, কাঠমান্ডুর ‘ব্র্যান্ড নিউ’ সরকারের জন্য তিন দেশের পক্ষ থেকে আরও আসছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এত ‘অফার’ দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ কী দিতে পারে? ‘হামার’ বলেন্দ্রের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের বাইরেও এ নিয়ে ঢাকাকে ভাবতে হবে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
