ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আঁচল মা সুমি: ছোট সুযোগ, বড় পরিবর্তন

আঁচল মা সুমি: ছোট সুযোগ, বড় পরিবর্তন
×

মো. আবুল বরকাত

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১৪:৪১

সকালে যখন গ্রামের আঁচল কেন্দ্রে (শিশুযত্ন কেন্দ্র) ছোট ছোট শিশুরা জড়ো হয়, তখন তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হাসিমুখের নারীটিকে সবাই চেনে ‘আঁচল মা সুমি’ নামে। মাসুমা আক্তার সুমি। মাধ্যমিক পাস করার পর বিয়ে, সংসার, সন্তান- জীবন যেন চার দেয়ালের মধ্যেই আটকে গিয়েছিল। সমাজের জন্য কিছু করার বাসনা থাকলেও সুযোগ ছিলনা। 

পরিবর্তন শুরু হয় ২০১৭ সালে। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে একটি প্রকল্পের আওতায় তিনি ‘আঁচল মা’ (শিশুযত্নকারী) হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। আঁচল খোলা হয় তার ঘরেই। শুরুতে এ কাজকে কেবল একটি আয়ের সুযোগ হিসেবে ভেবেছিলেন সুমি। তবে কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি বুঝতে পারেন এটি শুধু চাকরি নয়, এ তার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সূচনা। প্রতিদিন চার ঘণ্টা ১-৪ বছর বয়সী শিশুদের আঁচল ঘরে নিরাপদে রাখা, খেলার মাধ্যমে শেখানো, বিকাশে সহায়তা করা, অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলা, সভা করা- এসবের ভেতর দিয়েই বদলে যেতে থাকে সুমির জীবন। ঘরের কাজ সামলে সামাজিক কাজেও জড়াতে থাকেন প্রতিনিয়ত। ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তাঁর ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে, বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসে। সুমি নিজের মতো করে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। একসময় যিনি শুধু নিজের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন, তিনিই ক্রমেই হয়ে উঠলেন গ্রামের আস্থার মুখ।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় পানিতে ডুবা প্রতিরোধ কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নদী, খাল আর পুকুরে ঘেরা আমাদের দেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। এই বাস্তবতা বদলাতে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি), রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউশন (আরএনএলআই) ও প্রিন্সেস শার্লিন অব মোনাকো ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বরিশাল বিভাগে প্রথমে ‘ভাসা’ ও বর্তমানে ‘নিরাপদে ভাসা’ নামে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের সম্মুখভাগে কাজ করছেন সুমির মতো হাজারো নারী। প্রকল্পের আওতায় বরিশাল বিভাগে জানুয়ারি ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ২৪৩২ জন নারী আঁচলের মাধ্যমে ৪২,৪২৩ শিশুর নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করেছেন। ৬০,৫৭১ শিশু জীবনরক্ষাকারী সাঁতার শিখেছে সফলভাবে, ৬৬৩ জনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিলেন নারী প্রশিক্ষক। ফার্স্ট রেসপন্ডার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪,০৪৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশই নারী।

ফিরে আসি সুমির গল্পে। কাজের অভিজ্ঞতা ও মানুষের উৎসাহ তাঁকে ২০২২ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে প্রার্থী হতে সাহসী করে তোলে। অনেকেই অবাক হয়েছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষ তাঁকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে তার কাজ, আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের গুণে। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হয়েও তার পরিচয়ের সবচেয়ে প্রিয় অংশটি রেখেছেন আগের মতোই ‘আঁচল মা সুমি’। সুমি সবসময় অভিভাবকদের বলেন, “ছেলে-মেয়ে সন্তানের মধ্যে ভেদাভেদ নয়, সমান যত্ন দিন। শিশুর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখলে চুপ থাকবেন না। নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হোন।” আত্মবিশ্বাসী নারী শুধু নিজের নয়, অন্যের জীবনেও আলো জ্বালান।

গ্রামবাংলার সুমিরা সংবাদ শিরোনামে আসেন না। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজে তারা বদলে দিচ্ছেন সমাজের চিত্র। নিরাপদ রাখছেন শিশুদের, শক্তিশালী করছেন পরিবারকে, সাহস দিচ্ছেন অন্য নারীদের। নারী দিবসে তাই বড় বড় অর্জনের পাশাপাশি এই নীরব নেতৃত্বের গল্পও বলা দরকার।

কারণ একজন সুমি বদলালে, বদলে যায় একটি গ্রাম। আর গ্রাম বদলালে বদলে যাবে বাংলাদেশ, নিশ্চিত হবে উন্নত ভবিষ্যত।

মো. আবুল বরকাত: উপ-পরিচালক, সিআইপিআরবি
[email protected] 
 

আরও পড়ুন

×