অন্যদৃষ্টি
মশা মারতে পুরস্কার দাগা
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মশা মারতে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক। তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জন্য এ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। মশার প্রকোপ যখন কমছে না, তখন প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে তাঁর এ ঘোষণা প্রশংসনীয়। যেখানে তাঁর বক্তব্য, ‘যাদের পারফরম্যান্স ভালো থাকবে, তাদের সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হবে।’ প্রশ্ন হলো, এই ‘পারফরম্যান্স’ দেখবে কে? ডিএনসিসিতে মশা মারার কর্মীরা কতটা সক্রিয়, আমার জানা নেই। তবে একই এলাকার বাসিন্দা হিসেবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তিক্তই বলতে হবে। মাঠ পর্যায়ের মশক কর্মীদের যেখানে দেখা মেলে কালেভদ্রে। পুরস্কারের ঘোষণা তাদের কতটা প্রণোদনা দেবে, সেটাই দেখার বিষয়।
যে দৌড়ায় তার যেমন পরিশ্রম আছে, যে তার পিছু নেয়, তারও পরিশ্রম কম নয়। পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাই মূল্যায়নেরও বিষয় আসে। যেমন প্রতিটি এলাকায় মাঠকর্মীরা কতদিন পরপর মশার ওষুধ ছিটাবেন, কতটুকু ছিটাবেন। সেই ওষুধ কতটা কার্যকর হলো ইত্যাদি বিষয় আগে থেকেই নির্ধারণ করা জরুরি। বর্তমান প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি মাসের শুরুতে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, মশা নিয়ন্ত্রণে দিনে তিনবার ওষুধ প্রয়োগ করা হবে; থাকবে কুইক রেসপন্স টিম। প্রশ্ন হলো, দিনে তিনবার কি একই এলাকায় প্রয়োগ করবে? এখানে সমন্বয় দেখা দরকার। তা না হলে দেখা যাবে, এক এলাকায় তিনবার হলেও অন্য এলাকায় তিন সপ্তাহেও কেউ যাচ্ছে না।
ডিএনসিসিতে মশা নিধন কতটা হচ্ছে, তার একটা নমুনা গত মাসে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকের একটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট। যেখান দেখানো হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটিতে মৃত ব্যক্তির নামও মশা নিধন কর্মীর তালিকায়। প্রতিবেদক অনুসন্ধান করে দেখেছেন, আড়াই বছর আগে ওই কর্মী মারা গেলেও ওয়েবসাইটে তাঁর নাম লেখা। স্বাভাবিকভাবেই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নির্বাচিত মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দীর্ঘ অনুপস্থিতি মশা নিধনের মতো কাজের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের পাশাপাশি তদারকিতেও ঘাটতি তৈরি করেছে। এখনও সরকার এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক বসিয়ে কাজ করতে চাইছে। এতে জনগণ কতটা সেবা পাবে– সে প্রশ্নও উঠছে।
ঢাকায় মশা নিধন কর্মীদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না। হাজিরা খাতায় তাদের উপস্থিতি ঠিক থাকলেও মাঠে ওষুধ ছিটাতে তাদের পাওয়া যায় না। তা ছাড়া যা রয়েছে তা আবার কার্যকরী নয়। এমন পরিস্থিতিতেই ডিএনসিসির প্রশাসক পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। কেবল ডিএনসিসিতেই নয়, দেশের অন্যত্র যেভাবে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনার রুটিন আছে, তার যথাযথ প্রতিফলন হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ এতটা বাড়ার কথা নয়। স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা এবং ওষুধ ছিটানোয় অনিয়ম ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে মশা কমছে না; ডেঙ্গুও নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এখনও যেভাবে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তা অশনিসংকেত।
বর্ষা সামনে রেখে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় ডিএনসিসির প্রশাসক মশা মারতে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। এখানে তাঁর সদিচ্ছা সাধুবাদযোগ্য। মনে রাখতে হবে, পুরস্কার ঘোষণার বিষয়টা সাময়িক এবং কার্যকর সমাধানে নিয়মিত কর্মসূচিই ভরসা। নিয়মিত কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা কাজ করছেন কিনা, তার জোরদার তদারকির বিকল্প নেই।
ডেঙ্গু এখন আর ঋতুভিত্তিক সংকট নয়, বরং সারাবছরের জন্যই চ্যালেঞ্জ। গত বছরও ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে; আক্রান্ত হয়েছে লক্ষাধিক। এ বছরও সংক্রমণ থেমে নেই। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। বারবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। ডিএনসিসির পুরস্কারের মাধ্যমে অন্তত সে বিষয়টি আমরা দেখতে চাই।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
