ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

ভূমধ্যসাগরে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে ফেরাবে কে?

ভূমধ্যসাগরে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে ফেরাবে কে?
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ যেন বারবার আমাদের কাছে একই করুণ বার্তা বয়ে আনে। স্বপ্নের খোঁজে যাত্রা করা তরুণদের জন্য তা এক নীরব মৃত্যুফাঁদ। লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা আজ আর শুধু দুঃসাহসিক ভ্রমণ নয়; এটি অনেকের জন্য জীবনের শেষ যাত্রা। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১০ তরুণসহ ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যু সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। অথচ এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি বিপজ্জনক প্রবণতার অংশ, যেখানে স্বপ্ন, প্রতারণা ও ঝুঁকি মিলেমিশে তৈরি করছে এক ভয়াবহ মানবিক সংকট। 

এই সংকটের গভীরে প্রবেশ করলে প্রথমেই সামনে আসে ‘পুশ’ ও ‘পুল’ ফ্যাক্টরের জটিল বাস্তবতা। দেশের ভেতরে সীমিত কর্মসংস্থান, আয়ের অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য এবং উন্নয়নের অসম বণ্টন অনেক তরুণকে বিদেশমুখী করে তুলছে। অন্যদিকে ইউরোপ ঘিরে তৈরি হওয়া ‘স্বপ্নের বাজার’– উচ্চ আয়ের প্রলোভন, উন্নত জীবনযাত্রার কল্পনা এবং সফল প্রবাসীদের গল্প তরুণদের আকৃষ্ট করছে প্রবলভাবে। বাস্তবতা যতই কঠিন হোক, এই স্বপ্নের শক্তি অনেক সময় মৃত্যুঝুঁকিকে তুচ্ছ করে দিচ্ছে। এই স্বপ্নপথকে সবচেয়ে বিপজ্জনক করে তুলেছে সুসংগঠিত আন্তঃদেশীয় পাচার চক্র। এই চক্রের মধ্যে আছে স্থানীয় দালাল, যারা ইউরোপের সচ্ছল জীবনের স্বপ্ন ফেরি করে নিরীহ গ্রামীণ তরুণদের জন্য ফাঁদ তৈরি করে। এ বিস্তৃত নেটওয়ার্কে আছে মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট দেশ, বিশেষ করে লিবিয়া। তা ইউরোপের বিশেষ করে গ্রিস বা ইতালির উপকূল পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। প্রতিটি ধাপে রয়েছে আলাদা নিয়ন্ত্রক, যারা নিজেদের অংশের লাভ নিশ্চিত করতে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনকে পণ্যে পরিণত করছে। 

অভিবাসনের বৈধ পথগুলো যখন জটিল, ব্যয়বহুল ও সীমিত হয়ে পড়ে, তখনই এই চক্রগুলো বিকল্প পথ নিয়ে হাজির হয়। শক্তিশালী ফাঁদ তৈরি করে। ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দক্ষতার স্বীকৃতির অভাব এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা অনেককেই শর্টকাট পথের দিকে ঠেলে দেয়। পাচারকারীরা এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া প্রতিশ্রুতি, জাল কাগজপত্র এবং সামাজিক প্রভাবের মাধ্যমে তরুণদের প্রলুব্ধ করে। 

এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। তা হলো, দেশে মানব পাচারবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও এই চক্র এত শক্তিশালী হলো কীভাবে? বাস্তবতা হলো, এই আইনের প্রয়োগে রয়েছে নানা ঘাটতি। তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আন্তঃদেশীয় সমন্বয়ের অভাব, সীমিত গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং কখনও কখনও আইন প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাচারকারীদের জন্য ‘নিরাপদ পরিবেশ’ তৈরি করে। ফলে তারা অনেক সময় প্রায় শাস্তিবিহীন সংস্কৃতির মধ্যে থেকে নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। 

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। লিবিয়ার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাহীনতা এটিকে একটি বড় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত করেছে, যেখানে পাচারকারীরা প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বীভাবে কাজ করে। ইউরোপীয় দেশগুলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি গ্রহণ করলেও সেই নীতির ফলে বৈধ পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পথগুলো আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ একদিকে সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে চাহিদা– এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে পড়ছে বিভিন্ন স্বল্পোন্নত দেশের অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষ। 

এদিকে সামাজিক বাস্তবতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। আমাদের সমাজে বিদেশে যাওয়া এখনও একটি মর্যাদা হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক পরিবার সামাজিক অবস্থান উন্নত করার আশায় কিংবা আত্মীয়স্বজনের প্রভাবে সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে আগ্রহী হয়। এই সামাজিক চাপ অনেক সময় তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে, যেখানে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাই প্রাধান্য পায়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক উদ্যোগ। প্রথমত, অভিবাসনের বৈধ পথগুলোকে সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানব পাচারবিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা জোরদার করতে হবে, যাতে পুরো নেটওয়ার্কটিই ভেঙে ফেলা যায়। তৃতীয়ত, গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের বাস্তবতা তুলে ধরে তরুণদের সচেতন করা জরুরি। চতুর্থত, দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বিদেশমুখী হওয়ার চাপ কমে। 

সবশেষে বলা যায়, ভূমধ্যসাগরের এসব মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন– রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, বৈশ্বিক; সর্বস্তরেই। প্রতিটি হারানো প্রাণ আমাদের কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়, আমরা কি এসব মৃত্যুকে কেবল খবরের শিরোনাম হিসেবে দেখব, নাকি এর পেছনের কারণগুলো সমাধানে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেব?
স্বপ্ন যদি বারবার মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, তবে সেই স্বপ্নকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এখন প্রয়োজন মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত অভিবাসন ব্যবস্থার, যেখানে কোনো তরুণকে আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অজানা পথে পা বাড়াতে হবে না। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী 

আরও পড়ুন

×