জনস্বাস্থ্য
স্বাদুপানির মাছ চাষে সাফল্য: আশা ও আশঙ্কা
আবু আলা মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাছে-ভাতে বাঙালি– এটা শুধু কথার কথা নয়; বাস্তবেও বাংলাদেশের মানুষের মোট আমিষ জাতীয় খাদ্যের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। আর মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশের জীবিকা নির্ভর করে মৎস্য খাতের ওপর, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ২.৫৩ শতাংশ। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-এফএওর ২০২৪ সালের ‘বিশ্ব মৎস্য শিকার ও মৎস্য চাষ পরিস্থিতি ২০২৪’ শীর্ষক দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে ২০২৪ সালে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। ২০২২ সালের উপাত্ত ব্যবহার করে তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট বৈশ্বিক স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনের ১১.৭ শতাংশ ছিল এ দেশে। বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য বিভাগ প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষপুস্তক, ২০২৩-২৪’ অনুসারে দেশে মৎস্য খাতের প্রবৃদ্ধি মূলত মৎস্য চাষকেন্দ্রিক। এ সময়ে দেশে মোট মৎস্য চাষ হয় প্রায় ৪৭ লাখ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয় প্রায় ৪৪ লাখ টন মাছ। এর মধ্যে পুকুরে প্রায় ২৪ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট উৎপাদনের ৪৭.২০ শতাংশ। এটা আগের বছরের চেয়ে ৯৬ হাজার ৭৪ টন বেশি এবং প্রবৃদ্ধির হার ৪.২৩ শতাংশ। এ সময়ে ৪.২৪ লাখ হেক্টর জমিতে পুকুর ছিল, যা আগের বছরের ৪.১৫ লাখ হেক্টর থেকে আট হাজার ২৯৬ হেক্টর বেশি।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও ক্ষুদ্র আয়তনের একটি দেশের জন্য এটা নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ অর্জন। একই সঙ্গে গর্ব করার মতো এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এ সাফল্য কি শুধু গর্বের, না তার পেছনে আশঙ্কাও রয়েছে?
আমাদের মৎস্য খাতের বাস্তব অবস্থা একটু খতিয়ে দেখা যাক। মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষপুস্তক, ২০২৩-২৪ অনুসারে দেশে সর্বাধিক উৎপাদিত স্বাদুপানির মাছের প্রজাতির প্রথম তিনটি (থাইপুঁটি/সরপুঁটি, পাঙাশ, তেলাপিয়া) আর মোট ১৪টির মধ্যে ছয়টি (থাইপুঁটি/সরপুঁটি, পাঙাশ, তেলাপিয়া, সিলভার কার্প/বিগহেড কার্প, মিররকার্প/কারপিউ, গ্রাসকার্প) বিদেশি প্রজাতির। এর পাশাপাশি আরও নানা প্রজাতি যেমন– ব্ল্যাককার্প, পিরানহা, পাকু, গৌরামি, আফ্রিকান মাগুর, ভিয়েতনামের শোল, ভিয়েতনামের কই, সাকার মাছ বা অ্যামাজন আর্মার্ড ক্যাটফিশ ইত্যাদি চাষের জন্য এ দেশে আনা হয়েছে এবং পরে তা প্রাকৃতিক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জলাশয়ে ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির বিদেশি মাছ গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন। এসব প্রজাতি আবাস ও খাদ্যের জন্য স্থানীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এবং রাক্ষুসে প্রজাতিগুলো তাদের শিকার করে। ফলে এরা স্থানীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীগুলোকে বিপন্ন করার পাশাপাশি জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ভারসাম্যহীন, বিপর্যস্ত করতে পারে।
কিছু প্রজাতির তো আগ্রাসী প্রজাতিতে পরিণত হওয়ার উঁচুমাত্রার আশঙ্কা আছে (বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে তা ঘটে গেছে), যা অন্য স্থানীয় প্রজাতিগুলোর টিকে থাকাকে বিপন্ন করে তোলে এবং পরিবেশের বিপর্যয় ঘটায়। পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়ে বাণিজ্যিক মাছ চাষে সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করতে পুকুরের পানির অনুপাতে মাছের ঘনত্ব থাকে অত্যন্ত বেশি। এদের খুব দ্রুত বড় করে তুলতে হয়। ফলে প্রচুর পরিমাণে খাবার লাগে। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মাছের খাদ্য বেশ ব্যয়বহুল, যা প্রান্তিক, ছোট ও মাঝারি আকারের খামারি বহন করতে পারেন না। তাই তারা খরচ কমাতে নানা বিকল্প অনুসন্ধান করেন। এমনই একটি বিকল্প হলো বাণিজ্যিক খামারের মুরগির বিষ্ঠা। অন্যদিকে অনেক মুরগির খামার এখন স্বল্প লাভ ও বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তাজনিত আর্থিক ঝুঁকি কমাতে মুরগির পাশাপাশি মাছ চাষে ঝুঁকছে। যেখানে পুকুরের ওপরে বা পাশে মুরগির খামার করা হয় আর মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি পুকুরে পড়ে, যা মাছ খায়। তাই আর মাছের খাবার কিনতে হয় না। যেহেতু এতে খরচ কম, ফলে লাভ বেশি, তাই শুধু প্রান্তিক খামারি নয়, বরং বড় করপোরেট মাছের খামারেও এখন মুরগির বিষ্ঠা প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তারা বড় বড় মুরগির খামার থেকে গাড়ি ভর্তি করে বিষ্ঠা নিয়ে পুকুরে ফেলে। কিন্তু মুরগির বিষ্ঠায় থাকে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু, যার মধ্যে বড় অংশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। এ ছাড়া থাকে খাবারে মিশ্রিত অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, কীটনাশক ও ভারী ধাতুর অবশেষ। এসব উপাদান দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে সক্রিয় থাকতে পারে। এগুলো মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ–মাছের সংস্পর্শ, মাছ খাওয়া বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে গিয়ে সরাসরি মানুষকে অসুস্থ করে তুলতে পারে। (বিস্তারিত হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ব্যবস্থাপনা যখন জরুরি, সমকাল, ২২ জানুয়ারি ২০২৬)
দেশে চার লাখ ২৪ হাজার ১৬৮ হেক্টর জমিজুড়ে যেসব পুকুর আছে, এর বেশির ভাগই সারাবছর পানি ধরে রাখতে পারে না। কারণ পানি বাষ্প হয়ে উড়ে যায় এবং ভূগর্ভস্থ জলস্তরও নিচে নেমে যাওয়ায় চুইয়ে আসা পানিতে তা পূরণ হয় না। ফলে বছরের একটা বড় সময় ধরে এগুলোকে মাছ চাষযোগ্য রাখার জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে পূর্ণ রাখতে হয়। এর জন্য বিপুল পরিমাণ পানি লাগে। মাছ চাষের জন্য গড়পড়তায় ৪ ফুট বা ১.২ মিটারের মতো গভীর পানি থাকতে হয়। এক একর জমিতে এই গভীরতার জন্য ১৩ লাখ তিন হাজার ৪০৪ গ্যালন বা ৪৯ লাখ ৩৩ হাজার ৯২৭ লিটার পানি প্রয়োজন। এটা দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের পুকুর বা বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষের যে অগ্রগতি, তার পুরোটাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। কারণ এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের ভূগর্ভস্থ পানির মজুত ফুরিয়ে যাবে বা জলস্তর এত নিচে নেমে যাবে যে তা সংগ্রহ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তখন পুকুরে পানিই থাকবে না, মাছ চাষ তো দূরের কথা। এর চেয়েও অনেক বড় বিপদের কথা হলো, ইতোমধ্যে ক্ষয়িষ্ণু ভূগর্ভস্থ পানির মজুত আরও কমে গিয়ে আমাদের সুপেয় জলের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
একে যদি আমরা বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে দেখি, তবে আমাদের দেশ নদীমাতৃক বলে পরিচিত হলেও বেশির ভাগ নদী-নালা, খাল-বিল এখন শুকিয়ে যাচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমে নিম্নগামী। এটা ইঙ্গিত দেয়, ভূগর্ভস্থ জলস্তর থেকে আমরা বর্তমানে যে হারে পানি আহরণ করছি, তা এত বেশি যে, উত্তোলিত পানির ক্ষয় পূরণ হতে পারছে না। অন্যদিকে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় জলের সংকট চলমান। ভবিষ্যতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেমন মাছের চাহিদা বাড়বে, তেমনি বাড়বে পানীয় জলের চাহিদা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের বরফ গলা জলপ্রবাহ, যা আমাদের মিঠাপানি বা স্বাদুপানির অন্যতম প্রধান উৎস, তা কমে গিয়ে পানির সরবরাহ আরও কমিয়ে দেবে। এটা ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষয়পূরণকে আরও বিলম্বিত করবে। যার সম্মিলিত ফল হবে সুপেয় বা পানীয় জলের তীব্র সংকট, আমরা খাবার পানিই পাব না।
এ পানি উত্তোলন করা হয় বৈদ্যুতিক সেচযন্ত্র ব্যবহার করে। এতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়। এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে লাগে জীবাশ্ম জ্বালানি, যা জলবায়ু পরিবর্তনে আরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া যেখানে বিদ্যুতের সরবরাহ ইতোমধ্যে ঘাটতি, সেখানে এটা অন্যান্য জরুরি খাতে বিদ্যুতের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করে।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় আমাদের মাছ চাষের আপাত অর্জন আসলে দেশের মানুষের আমিষের একটি প্রধান উৎসকে শুধু অনিরাপদ নয়, বরং বিপজ্জনক করে তুলছে। কাজেই মাছ চাষে বিদেশি প্রজাতি, খাদ্য হিসেবে মুরগির বিষ্ঠা, সর্বোপরি ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর অনতিবিলম্বে সমাধান করতে না পারলে চলমান পন্থায় মৎস্য চাষে আমাদের আপাত ‘সাফল্য’ আগামী দু-এক দশকের মধ্যে বিভীষিকায় পরিণত হতে পারে।
আবু আলা মাহমুদুল হাসান: গবেষক
ও কলাম লেখক
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য
