উচ্চারণের বিপরীতে
‘ডিপ স্টেট’ জুজু বনাম আইনের শাসন
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকার যাতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারে, ‘ডিপ স্টেট’ সেই কৌশল সাজিয়ে দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, ‘যখন সরকারে ছিলাম, শুরুর দিকে বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদের ডিপ স্টেট বলা হয়, তাদের কাছ থেকে আমাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, শেখ হাসিনার যে মেয়াদ আছে ২০২৯ পর্যন্ত, সেটা আপনারা শেষ করেন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করব’ (সমকাল, ২৭ মার্চ, ২৬)। আসিফ মাহমুদ আরও জানিয়েছেন, ডিপ স্টেটের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ছিল, কিছু জায়গায় তাদের ‘ফ্যাসিলিটেট’ করা এবং তারা রোডম্যাপও করে নিয়ে এসেছিল।
আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। ডিপ স্টেটের সঙ্গে আসিফ মাহমুদসহ গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের সম্পর্ক কবে থেকে? আচমকা নিশ্চয় এই প্রস্তাবনার পিঠা হাজির হয়নি! জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে, না পরে থেকে? জুলাই আন্দোলনেও কি ডিপ স্টেট ছাত্রনেতাদের প্রভাবিত করেছিল? কতটা ঘনিষ্ঠতা বা ভরসা থাকলে ক্ষমতায় পোক্ত হয়ে বসবার উপায়ও বাতলে দিতে পারে তারা? আসিফ মাহমুদ মুখ মুছে ‘না, আমরা ক্ষমতায় আসবার শুরুতেই কেবল ডিপ স্টেট চিনেছি’ বলে পার পাবেন বলে মনে হয় না।
মনে আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দায়িত্বপ্রাপ্তির কয়েক দিনের মধ্যে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত ৭.৬২ স্নাইপার রাইফেল এ দেশের পুলিশ ব্যবহার করে না! এই কথার প্রেক্ষিতে সাখাওয়াত হোসেনকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নির্বিচারে ছাত্র-জনতা হত্যায় ব্যবহৃত রাইফেল পুলিশের নয়– খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এমন বক্তব্য এত সরল ধাঁধা হতে পারে না যে কেবল দায়িত্ব থেকে সরানোর মাধ্যমেই উত্তর দেওয়া যায়।
ওদিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সম্প্রতি বলেছেন, ‘ওসমান হাদি হত্যার সাথে জড়িত ছিল ডিপ স্টেট’ (চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, ১০ মার্চ, ২৬)। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের ডিপ স্টেট সংক্রান্ত এসব অভিযোগ নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে না। অভিযোগকারীদেরই বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণাদি উপস্থিত করে জাতিকে জানাতে হবে। ‘ভূত এসেছিল’ বলে ধোঁয়া ছড়িয়ে মৃদুহাস্যে পরবর্তী ভূতের সন্ধান আমাদের রাজনীতিতে নতুন নয়।
২.
বলা বাহুল্য, ডিপ স্টেট সকলের সামনে আসে না। অবশ্য ‘জেনারেল স্টেট’ জনসাধারণের সামনে প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন নিয়ে আসে। যেমন এবারের ঈদযাত্রায় বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সারাদেশে ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য অবকাঠামো। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৬ মার্চ ভোর পর্যন্ত দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হন। সড়ক, নৌ ও রেলমন্ত্রী রোববার বলেছেন, ‘যে কোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছে।’
মনে আছে, আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রায়শ তখনকার ঈদযাত্রাকে যে কোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তির বলে উল্লেখ করতেন। এবারও যেন তারই পুনরাবৃত্তি। ঈদের ছুটিতে সংবাদমাধ্যমে দেখা গেল– পদুয়ায় রেলক্রসিং না থাকায় ট্রেনের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে বাস; এমপি সাহেব কাঁদতে কাঁদতে মন্ত্রী সাহেবকে বলছেন, শত অনুনয়ের পরও তাঁর এলাকায় রেলক্রসিং হয়নি, মরছে শত শত মানুষ! আমরা দেখলাম ছিন্নভিন্ন মাইক্রোবাস, মহাসড়ক থেকে ধানক্ষেত অভিমুখী দূরপাল্লার বাস, রেললাইনে বসা মানুষের ওপর উঠে যাওয়া ট্রেন, ফেরিতে উঠতে গিয়ে জলের গভীরে ঝাঁপ দেওয়া যাত্রীভর্তি বাস! মানুষ যেন সংখ্যামাত্র। আর কিছু নয়।

মানি, এ সকলই দুর্ঘটনা। এ-ও সত্য; দেড় মাস বয়সী সরকার দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এত দ্রুত ঠিক করতে পারবে না। তবে জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের উপস্থিতি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো দুর্ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বদলে মন্ত্রী যখন আস্থার সঙ্গে বলেন, ‘দু-একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে’, তখন তা জাতির সঙ্গে তামাশার শামিল।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে ১৫ দিনে ৪৪ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী বলেছেন, ‘এতগুলো শিশুর মৃত্যু হয়েছে, অথচ আমাদের জানানো হয়নি যে ভেন্টিলেটর নেই। তাঁকে (পরিচালক) ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত’ (সমকাল, ২৯ মার্চ, ২৬)।
মন্ত্রীর রাগ বা উত্তেজনা সংগত হলেও দুরবস্থার যথাযথ কারণ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিচার করে তা অবশ্যই জাতিকে জানাতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো উত্তেজনাতে কাজের কাজ হবে না। হাসপাতালে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী না থাকবার কারণে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটবার পর যদি হাসপাতালের ত্রুটির সন্ধান মেলে; তবে এই কাণ্ডের গলদ যে কোথায়– তা যুক্তিতে বোঝানো কঠিন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য রোববার সংসদকে জানিয়েছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নমূলক কাজের কোনো তহবিল নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গজ, ব্যান্ডেজ ও সিরিজ কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকাও নেই।’ তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের লুটপাটের কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও যা কিছু ছিল তা নিঃশেষ হয়ে গেছে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের কথা জনবিদিত, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার? হা হতোস্মি! তুমিও ব্রুটাস! তৃণমূলের যাবতীয় কাঠামো ফোকলা করে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার? তাহলে এসবের হিসাব কোথায়? সম্প্রতি হামের প্রকোপে সারাদেশে ৪১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়ায় বর্তমানে দেশে হামসহ আরও ৮/১০টি রোগের টিকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক এমডি নূরজাহান বেগমকে কোন যোগ্যতায় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পদে বসিয়েছিলেন ড. ইউনূস? অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকারী ‘প্রভাবশালী’ ছাত্রনেতারা স্বাস্থ্য খাতে ডিপ স্টেটের ভূমিকার কথা কি কিছু বলছেন? অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে কারা স্বাস্থ্য খাতের অবশিষ্টাংশ নিঃশেষ করল? তার হিসাবনিকাশ হবে না!
০৩.
হিসাবনিকাশ অবশ্যই সবকিছুর হতে হবে। এটাই আইনের শাসনের মৌল কথা। প্রতি মাসে গড়ে সাতটির বেশি অধ্যাদেশ জারি করে দেশ চালানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষাকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের অতি আগ্রহ দেখা গেলেও সহজে বাস্তবায়নযোগ্য প্রয়োজনীয় জনপদক্ষেপে তাদের আগ্রহ ছিল না। এরই পরিণতি বর্তমান স্বাস্থ্য খাতের সর্বস্বান্ত পরিস্থিতি। সড়কে নৈরাজ্যের পেছনেও রয়েছে একই ধরনের দায়িত্বহীনতা ও অর্বাচীনতা। বর্তমান সরকারকে তাই দ্রুত শ্বেতপত্র তৈরি করে জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কথার সঙ্গে কাজের অমিলের দলিল হয়ে থাকবে এই শ্বেতপত্রগুলো। দেশে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয়, ক্ষমতাকাঠামোয় ডানপন্থার বিকাশের যে প্রয়াস আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখেছি; ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জনসাধারণ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের খাতওয়ারি শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং সেইমতো ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। ডিপ স্টেটের অপ্রকাশ্য জুজু নয়; আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রকাশ্য আইনের শাসন দেখতে চাই।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
mahbub [email protected]
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
