রাজনীতি
‘হানিমুন পিরিয়ড’ মেজাজে না থাকাই ভালো
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
তারেক রহমান সরকারের মাত্র দেড় মাস হতে চলল। এ সময় (হানিমুন পিরিয়ড) বিরোধী দল, এমনকি জনগণেরও সরকারকে কম চাপে রাখার কথা। কিন্তু যে পরিস্থিতিতে তারা দায়িত্ব নিয়েছেন এবং নিয়েও যে পরিস্থিতির মুখোমুখি, তাতে সরকার আছে চাপের মুখে; সমালোচনাও বাড়ছে।
দেশে নজিরবিহীন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর টালমাটাল পরিস্থিতি সামলাতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল। তারা গণতন্ত্রে উত্তরণে দেরি করায় কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা মেলেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে নির্বাচিত সরকারকেই।
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর তাদের ব্যর্থতার দিকগুলোও সামনে আসছে। সর্বশেষ হামের টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী শাসনামলে ঘটা ব্যর্থতার দিকটি সামনে এসেছে শিশুদের করুণ মৃত্যুর ঘটনায়। ১০-১২টি রোগ প্রতিরোধে টিকাদানের এ কর্মসূচিতে আমাদের সাফল্য ছিল। এর মাধ্যমে কোনো কোনো রোগ নির্মূলেও সমর্থ হয়েছিলাম। শিশুদের হাম প্রতিরোধেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। অথচ এক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত শিশুমৃত্যুর খবর এসেছে, তাতে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। কেন্দ্রীয় গুদামে হামের টিকা ফুরিয়ে আসার খবরে সরকারও উদ্বিগ্ন। বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হচ্ছে।
জরুরি আরও কিছু টিকার মজুত সন্তোষজনক নয়। স্থানীয় পর্যায়ে টিকা পৌঁছানোয় নিয়োজিতদের বেতন-ভাতা নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি নাকি হয়নি। টিকা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি রয়েছে বলেও জানা যায়। এ অবস্থায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গৃহীত হলেও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা হ্রাস কিংবা বন্ধের কথাও জানা। এ অবস্থায় সরকারের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছিল। সেটা দ্রুত উন্নত করা যাবে না। এরই মধ্যে জরুরি বরাদ্দগুলো বাড়ানো চ্যালেঞ্জের।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা দেখেছিলাম। সার্বিক সক্ষমতা বিচার না করেই সেটা করা হচ্ছিল মনে হয়। শুরুতে আসলে প্রয়োজন নিয়মিতভাবে দেওয়া বরাদ্দের সদ্ব্যবহার। অর্থ সংকটে টিকা সংগ্রহে ব্যাঘাত ঘটে থাকলে দেখা দরকার, উপযুক্ত ক্ষেত্রে অর্থ জোগানোয় সমন্বয়হীনতা ছিল কিনা। অন্তর্বর্তী শাসনামলে এডিপির বাস্তবায়ন কমিয়ে এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর কথাই বরং শোনা যেত। বেশি দিন নেই; নতুন বাজেট দিতে হবে সরকারকে। এটি প্রণয়নের সময়টায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। টিকাদান কর্মসূচিতে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে হবে আমাদের। মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও এর রয়েছে গভীর সম্পর্ক।
দায়িত্ব নিয়ে রমজানের পণ্যবাজার সামলাতে অবশ্য সরকারকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। এ লক্ষ্যে কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতেও তারা অসফল ছিল না। তবে এটা এখনও উচ্চ পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম কমতির দিকে থাকায় আশা ছিল পরিবর্তিত সময়ে মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ধারা জোরালো হওয়ার। তারেক রহমান সরকার আবার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের মতো নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছিল। জোর দেওয়া হয় খাল খননে। এতে সামাজিক ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানে অগ্রগতি হবে বলেই মনে করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে সরকারের সামনে হাজির হয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এটা ছিল অনেকেরই ধারণার বাইরে।

সরকারকে এখন সবচেয়ে বেশি সামলাতে হচ্ছে জ্বালানি পরিস্থিতি। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে মব সহিংসতা বিদায় নিয়েছিল, বলা যায়। উদ্যোক্তারাও মবের কারণে সংকটে ছিলেন। সবাই আশা করছিলেন, এবার পূর্ণোদ্যমে কাজ শুরু করবেন। অর্থনীতিবিদরা বলছিলেন, নতুন সরকার এলে বিনিয়োগে গতি আসবে এবং বাড়বে প্রবৃদ্ধি। কর্মসংস্থানে সংকট কাটতে শুরু করবে। বিএনপিও নির্বাচনী ইশতেহারে কাজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছিল। এর বদলে এখন শঙ্কা জ্বালানি ঘিরে অর্থনীতি নতুন করে সংকটে পড়ার। আমাদের প্রায় সব খাতই ঘুরেফিরে জ্বালানিনির্ভর এবং আমরা এ ক্ষেত্রে বিপুলভাবে আমদানিনির্ভর। ইরান যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানির দাম শুধু বাড়ছেই না; এর প্রাপ্যতা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংকট। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশগুলোরও সংকটে পড়ার শঙ্কা। আমাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন জ্বালানি বিতরণে সৃষ্ট সংকটের খবর গুরুত্বসহ প্রকাশ করা হচ্ছে। সরকারি ভাষ্যের পাশেই থাকছে সরেজমিন প্রতিবেদন। জ্বালানি সংগ্রহে ভোগান্তির শিকার মানুষের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য চিত্র নিয়ে খবরও তৃণমূল পর্যন্ত মানুষের জানা। এ অবস্থায় ‘প্যানিক বায়িং’ সামলানো যে কোনো সরকারের পক্ষে কঠিন। প্রশাসন পুরোনো হলেও নজিরবিহীন এ পরিস্থিতি সামলানোয় তাদের ব্যর্থতাও যেন স্বাভাবিক! নানান জায়গা থেকে লুকানো জ্বালানি তেল বের হচ্ছে। তেল আর মিলবে না; দাম বাড়ানো হবে– এ দুই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই সংশ্লিষ্টরা এসবে জড়াচ্ছে। সংকটে অন্যান্য জরুরি পণ্য নিয়েও এসব ঘটে থাকে। কিন্তু জ্বালানি তেল তো ‘কৌশলগত পণ্য’। বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে কেনা এসব পণ্যের মজুতদারি ঠেকানোও বড় কাজ হয়ে উঠেছে সরকারের।
নতুন অর্থবছরের আগ পর্যন্ত দাম না বাড়িয়ে জ্বালানি জোগাতে হলে কত বাড়তি অর্থ লাগবে, সেই হিসাব কষে সরকার উদ্যোগী হয়েছে দুই-তিন বিলিয়ন ডলার সংগ্রহে। আইএমএফ ঋণের কিস্তিও নিশ্চিত করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার রিজার্ভটা মোটামুটি সন্তোষজনক জায়গায় রেখে গেছে অবশ্য। এখন জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্য আনতে বেশি ডলার ব্যয় হলে রিজার্ভে দ্রুতই চাপ পড়বে। সরকার বলছে, চলমান বোরো মৌসুমে সারের সংকট হবে না, যদিও সিংহভাগ সার কারখানা বন্ধ গ্যাস সংকটে। তবে এরই মধ্যে সার আমদানি সচল রাখতে হবে নতুন উৎস থেকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার আমদানিও ব্যাহত এখন। দামও বিপুলভাবে বেড়েছে। সরকারের পহেলা বৈশাখ থেকে কৃষক কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে যাওয়ার কথা। তবে উৎপাদন মৌসুমে সারের সংকট হলে কৃষকের মাথা ঠিক থাকবে না। এরই মধ্যে খবর– সেচের জন্য চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না তারা।
যেভাবে হোক, বোরো ও আমন উৎপাদন ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। তাহলে আমরা মূল খাদ্যশস্যের সংকটে পড়ে যাব। জ্বালানি সংকটে গ্রীষ্মে এবার লোডশেডিং বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে গোটা অর্থনীতিতে। যুদ্ধ আরও ব্যাপকতা লাভ না করলেও ইতোমধ্যে জ্বালানির বাজার যেভাবে অস্থির হয়েছে, সেটা আমাদের ভোগাবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এমনিতেই কঠিন ছিল। যুদ্ধের প্রভাবে এটা কঠিনতর হবে। নতুন সরকার যত জনসমর্থনপুষ্টই হোক; এ ক্ষেত্রে তাদের লাগবে দক্ষতা। আন্তর্জাতিক সহায়তাও প্রয়োজন।
এর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের মতো ইস্যু বুদ্ধিমত্তা ও সদিচ্ছা দিয়ে সামলাতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অশান্ত হতে দেওয়া যাবে না। নিকটেই আরেকটি ঈদ রয়েছে। গেল ঈদে যে মাত্রায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে না পারলে সরকার তীব্রভাবেই সমালোচিত হবে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
