শিক্ষাঙ্গন
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য কিভাবে নিশ্চিত করবেন
মানসিক স্বাস্থ্য সেবা হতে হবে সম্পূর্ণ 'এভিডেন্স-বেজড' বা প্রমাণ-ভিত্তিক
ইমদাদুল হক তালুকদার
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৬ | আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:১৭
সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং একটি বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘বৈজ্ঞানিক লাইফস্টাইল ডেভেলপমেন্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম’ শিরোনামে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী সমাজ এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগের বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নিয়ে তীব্র আপত্তি ওঠে। জনস্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিক মহল থেকে প্রতিবাদের মুখে সরকার সম্প্রতি এই চুক্তিটি স্থগিত করার যে আদেশ জারি করেছে, তা একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক রাষ্ট্র হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত। তবে এই স্থগিতাদেশের পর আমাদের এখন গভীরভাবে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন যে, শিক্ষার্থীদের জন্য গৃহীত যেকোনো উদ্যোগ কি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 'স্কুল সাইকোলজি'র বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড বজায় রাখছে, নাকি তা মূলধারার বিজ্ঞানের সমান্তরালে কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের প্রচার করছে মাত্র?
প্রথমত, স্কুল সাইকোলজি বা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবা হতে হবে সম্পূর্ণ 'এভিডেন্স-বেসড' বা প্রমাণ-ভিত্তিক। অর্থাৎ, যে পদ্ধতিগুলো শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করা হবে, তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হতে হবে। বর্তমানের এই 'লাইফস্টাইল' ভিত্তিক শিক্ষাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আধ্যাত্মিকতা বা নির্দিষ্ট জীবনদর্শনের ওপর নির্ভরশীল, যা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বা সাইকিয়াট্রির স্বীকৃত প্রটোকল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্কুল সাইকোলজিস্ট। স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক কোনো কার্যক্রম বা উৎসাহব্যঞ্জক বক্তব্য সাময়িক উদ্দীপনা দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সংকটের নিরসন করে না। যেমন— ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, আত্মহত্যা প্রবণতা, একাডেমিক অমনোযোগিতা বা উদ্বেগের মতো সমস্যা উল্লেখযোগ্য। পেশাদারিত্বহীন ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাউন্সেলিং হিতে বিপরীত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিশেষজ্ঞের অভাব মেটাতে সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই কঠোর বৈজ্ঞানিক প্রটোকল মেনে হতে হবে। ডব্লিউএইচও-এর মতে, স্কুলভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি হতে হবে সম্পূর্ণ সার্বজনীন, বৈষম্যহীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে শিক্ষকদের ভূমিকা হবে মূলত 'গেটকিপার' হিসেবে—তারা প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করবেন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে রেফার করবেন। কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার ব্যক্তিগত ধ্যান-ধারণা বা 'লাইফস্টাইল প্যাকেজ' কখনোই বৈজ্ঞানিক ইন্টারভেনশনের বিকল্প হতে পারে না।
আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো স্কুল সাইকোলজি এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ কিছু কার্যকর মডেল দাঁড় করিয়েছে যা আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে। যেমন, ভারতের দিল্লি সরকার তাদের সরকারি স্কুলগুলোতে 'হ্যাপিনেস কারিকুলাম' চালু করেছে। এটি মূলত মাইন্ডফুলনেস, নৈতিক গল্প বলা এবং বিভিন্ন দলগত কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক চাপ কমিয়ে তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক জীবনবোধ তৈরি করতে সাহায্য করে। এটি কোনো ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং সোশ্যাল সাইকোলজি এবং নৈতিক শিক্ষার একটি বিজ্ঞানসম্মত সমন্বয়। একইভাবে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা তাদের জাতীয় শিক্ষা নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি 'লাইফ স্কিল' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং শিক্ষকদের ডব্লিউএইচও-এর প্রটোকলে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তারা কোনো বেসরকারি একক প্রতিষ্ঠানের দর্শনের ওপর নির্ভর না করে কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা অনুসরণ করছে। আমাদের দেশেও ইতোমধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাজীবিদের এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে এমন বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ইউনেস্কো ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিজি) যৌথ উদ্যোগে তৈরি 'সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং' (এসইএল) মডেল। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন মোটিভেশনাল ক্লাস নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্ক যা শিক্ষার্থীর আত্মসচেতনতা, আত্ম-ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মূল দক্ষতাগুলোকে লক্ষ্য করে তৈরি। বাংলাদেশে আমরা যখন ‘ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২০-২০৩০’ বাস্তবায়ন করছি, তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি 'ইন্টিগ্রেটেড স্কুল মেন্টাল হেলথ প্রটোকল' তৈরি করা।
ভবিষ্যতে এমন যেকোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, যেকোনো এনজিও বা বেসরকারি সংস্থা স্কুলে কাজ করতে চাইলে তাদের মডিউল অবশ্যই পেশাদার সাইকোলজিস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি উপজেলা বা জেলা পর্যায়ে স্কুল সাইকোলজিস্ট নিয়োগের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে হবে, যারা শিক্ষকদের তদারকি করবেন। তৃতীয়ত, ইউনেস্কো প্রস্তাবিত এসইএল মডেলটিকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা অথবা দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা একটি যুগোপযোগী মডেল তৈরি করে তা পাইলটিংয়ের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যেকোনো উদ্যোগই প্রশংসনীয়, তবে তা যেন বিজ্ঞানের পথ ছেড়ে লোকরঞ্জনবাদ বা নির্দিষ্ট কোনো আধ্যাত্মিক দর্শনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে। কিশোর মনের সঠিক বিকাশ কোনো শৌখিন উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার যা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আর এই পথটি হতে হবে পুরোপুরি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকে।
ইমদাদুল হক তালুকদার: মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
[email protected]
- বিষয় :
- মানসিক স্বাস্থ্য
- শিক্ষাঙ্গন
- শিক্ষার্থী
