মৃত্যুবার্ষিকী
দেশের প্রশ্নে অবিচল বিচারপতি
সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ (১১ ফেব্রুয়ারি ১৯১১-৩ এপ্রিল ১৯৭৯)
আতিক হেলাল
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদের আজ ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। মাহবুব মোরশেদ একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিতে তিনি প্রথম হয়েছেন। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি বগুড়া জিলা স্কুল থেকে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন। প্রবেশিকা পাসের পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৩১ সালে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং প্রথম শ্রেণিতে এলএলবি ডিগ্রি নেন যথাক্রমে ১৯৩২ ও ১৯৩৩ সালে।
মেধাবী ছাত্র মাহবুব মোরশেদ ছাত্রজীবনেই বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যেও বিখ্যাত লেখকদের উল্লেখযোগ্য বই পড়া শেষ করেন। কলেজজীবনে তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায়ও সম্পৃক্ত হন। প্রেসিডেন্সি কলেজ-ম্যাগাজিনের তিনি সম্পাদকও ছিলেন একবার। একই সময়ে তিনি তুখোড় বক্তা হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্ক দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন। কলেজজীবনে তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রেও সুনাম অর্জন করেন। ৩০-এর দশকে মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের সংগঠকের দায়িত্বও পালন করেন। সেকালে মুসলমান তরুণদের মধ্যে খেলাধুলায় অংশগ্রহণে এক ধরনের অনীহা ও অবহেলা ছিল। তরুণ মাহবুব মোরশেদ সেই নেতিবাচক অবস্থা দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মাহবুব মোরশেদ কলকাতা হাইকোর্টে অইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৩৪ সালে। তবে তিনি মামা এ.কে. ফজলুল হকের সহকারী না হয়ে সুভাষ চন্দ্রের অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসু (১৮৮৯-১৯৫০) এবং খ্যাতনামা অবাঙালি আইনজীবী কে.বি. খাইতানের জুনিয়র হয়ে কাজ করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন। এর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য যুক্তরাজ্য যান।
১৯৩৮ সালে মাহবুব মোরশেদ লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে বার অ্যাট ল (ব্যারিস্টার) ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি আবার আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্ট বার-এ যোগ দেন। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বারে প্র্যাকটিস করেন। ওই সময়টি ছিল পাকিস্তানের রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়।
ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর নির্বাচন, যুক্তফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা এবং শেরেবাংলার নেতৃত্বে গঠিত সেই সরকারের কেন্দ্র কর্তৃক বরখাস্ত হওয়া, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নানামুখী নির্যাতন ইত্যাদি ঘটনায় সময়টা ছিল উত্তাল। এসব ঘটনা নিয়ে তিনিও সচেতন ছিলেন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন।
বিচারপতি মোরশেদ প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায়ই প্রচণ্ড সাহসিকতা ও গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৬৬তে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফার খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যে ৬ দফার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবরণ করতে হয়। শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণেই বিচারপতি মোরশেদ ৬ দফা প্রণয়নে সম্পৃক্ত হননি; ৬৫-এর যুদ্ধের পর তিনি উপলব্ধি করেন, পূর্ববাংলার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও যথেষ্ট মজবুত ছিল না। এই বিষয়ও গভীরভাবে তাঁর চিন্তার মধ্যে ছিল।
১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে বিচারপতি মোরশেদ ‘ওয়ান ম্যান ওয়ান ভোট’ দাবি করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ওয়ান ইউনিট ভেঙে দেওয়ার পর জনসংখ্যার ভিত্তিতে পূর্ববাংলা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এ অঞ্চলের ভোটেই পাকিস্তান গঠিত হয়। যে কারণে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৯টি আসন পূর্ববাংলার প্রাপ্য। সেই হিসাবে এই অঞ্চলে যে দল বেশি আসন পাবে, সেই দলই কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের দাবিদার।
জানা যায়, ১৯৭১-এর ৮ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের এক দল আইনজীবী পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খানের শপথ গ্রহণ বিষয়ে বিচারপতি মোরেশেদের কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে তখন বলেছিলেন, এই মুহূর্তে দেশে একটা সাংবিধানিক ভ্যাকুয়াম চলছে। এই পরিস্থিতিতে টিক্কা খানের শপথ গ্রহণ সমীচীন নয়।
জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে বিচারপতি মোরশেদ ছিলেন অন্যতম প্রধান রূপকার– এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই। আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিচারপতি মোরশেদের মতো সাহসী, দেশপ্রেমিক ব্যক্তিত্বের বড় অভাব অনুভূত হয়।
আতিক হেলাল: কবি
- বিষয় :
- মৃত্যুবার্ষিকী
