তৃতীয় মেরু
মিয়ানমারে ‘নতুন’ প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশের পুরোনো কর্তব্য
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০০ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মিন অং হ্লাইং বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। সন্দেহ নেই, দেশটির ‘পিদংশু লুত্য’ বা ফেডারেল আইনসভার প্রথম অধিবেশনে তিনি ‘গোপন ব্যালটে নির্বাচিত’ হয়েছেন; আইনসভার দুই কক্ষ ‘আমইয়োতা লুত্য’ বা জাতীয় পরিষদ এবং ‘পিতু লুত্য’ বা জনপরিষদের মোট ৬৬৪ ভোটের মধ্যে ৪২৯টি পেয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা। বাস্তবে সেনাঅভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়ার পর থেকেই মিন অং হ্লাইং ‘নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকার এক মেয়াদ পূর্ণ করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হয়ে আরেক মেয়াদের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। এর মধ্যেই সেনা অভ্যুত্থান ঘটান জেনারেল হ্লাইং। সাত দিনের মাথায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন– এক বছরের মধ্যে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। সেই এক বছর পাঁচ বছরে ঠেকেছিল।
এর মধ্যে জেনারেল হ্লাইং যেমন এনএলডির সম্ভাব্য সব নেতাকর্মীকে জেলে ভরেছেন বা দেশছাড়া করেছেন, তেমনই জান্তাবিরোধী সব ধরনের বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ নিষ্কম্প ও নৃশংস হস্তে দমন করেছেন। সেনাবাহিনীতেও গত পাঁচ বছরে এমন জেনারেলদের ক্ষমতায়িত করেছেন, যারা তাঁর নিঃশর্ত অনুগত। যেমন প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে সেখানে যাঁকে বসিয়েছেন, সেই ইয়ে উইন উ বরাবরই জেনারেল হ্লাইংয়ের ব্লু আইড বয়।
মিয়ানমারের ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষে ২৫ শতাংশ আসন ‘টাটমাডো’ বা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নির্ধারিত। দুই ভাইস প্রেসিডেন্টের একজন এবং প্রতিরক্ষা, সীমান্ত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও নিতে হবে সেনাবাহিনী থেকে। এর পরও নির্বাচন দিতে জেনারেল হ্লাইং পাঁচ বছর নিয়েছেন মূলত তাঁর জ্যেষ্ঠ বা সমসাময়িক জেনারেলদের অবসরে পাঠানোর জন্য। এমনকি এবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সেনাপন্থি রাজনৈতিক দল ইউএসডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক জেনারেল খিন উয়ি নিয়মমতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে স্পিকারের চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দুই পূর্বসূরি জান্তা শ্য মং এবং থান শয়ে সর্বময় ক্ষমতা হাতে রাখলেও প্রেসিডেন্ট পদ নেননি। জেনারেল হ্লাইং সেই ঐতিহ্যও ভঙ্গ করেছেন।
সর্বশেষ বাকি ছিল যেনতেন একটি নির্বাচন ‘অনুষ্ঠান’। সেটা সহজ ছিল না। কারণ এবারের সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকেই স্টেট ও রিজিয়ন নির্বিশেষে কেবল বিক্ষোভ নয়, সশস্ত্র প্রতিরোধও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রসঙ্গত, দেশটির বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী ‘বামার’ অধ্যুষিত বৃহত্তর প্রশাসনিক ইউনিটগুলো ‘রিজিয়ন’ এবং বৃহত্তর নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল ‘স্টেট’ নামে পরিচিত। যেমন কাচিন স্টেট, শান স্টেট, কায়াহ স্টেট, কায়িন স্টেট, মন স্টেট, চিন স্টেট, রাখাইন স্টেট; শ্যাগেইং রিজিয়ন, মান্দালয় রিজিয়ন, ম্যাগওয়ে রিজিয়ন, বাগো রিজিয়ন, ইরাবতী রিজিয়ন, ইয়াঙ্গুন রিজিয়ন, তানিনতারি রিজিয়ন। ‘আমইয়োতা লুত্য’ বা জাতীয় পরিষদের আসনগুলো প্রতিটি রিজিয়ন ও স্টেটের জন্য ১২টি নির্ধারিত। মোট ১৬৮টি আসনের সঙ্গে সেনাবাহিনীর ৫৬টি আসন যুক্ত হয়।
দেশটির আইনসভার ‘পিতু লুত্য’ বা জনপরিষদের আসন হচ্ছে টাউনশিপভিত্তিক। টাউনশিপ বাংলাদেশের সাবেক মহকুমার মতো। মোট ৩৩০টি আসনের সঙ্গে ১১০টি সেনাবাহিনীর আসন যুক্ত হয়। ২০২২ সাল থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ এতটাই ছড়িয়েছে; ৩১৫টি টাউনশিপেই সামরিক অভিযান চালাতে হয়েছে জান্তাকে। যেমন নাফ নদের ওপাশের স্টেট রাখাইনে মোট ১৭টি টাউনশিপ রয়েছে। এর ১৪টিই গত এক বছর ধরে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে।
রাখাইন স্টেটে এখন সামরিক জান্তার দখলে মাত্র তিনটি টাউনশিপ; রাজ্য রাজধানী সিত্তয়ে বা প্রাচীন আকিয়াব, পার্শ্ববর্তী উপদ্বীপ চ্যাকফিয়ু এবং দ্বীপ মানঅং। এর মধ্যে পিতু ল্যু নির্বাচনে ইউএসডিপি দুইটি আসন এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল আরএনপি একটি আসন পেয়েছে। আবার আমইয়োতা লুত্য নির্বাচনে ইউএসডিপি দুটি এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এএফপি একটি আসন পেয়েছে। এই তিনটি আসনে প্রাপ্ত ভোটের হারকেই রাখাইনের অন্যান্য আসনে গড় করে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, রাখাইন স্টেটে প্রভাবশালী আরাকান আর্মির রাজনৈতিক সংগঠন এএলডি এবার নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল।

কথা হচ্ছে, মিয়ানমারে তথাকথিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সামরিক জান্তা শুধু বেসামরিক পোশাক পরেছে মাত্র। কার্যত আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগে সেনাবাহিনীর প্রবল আধিপত্য প্রবলতর হয়েছে মাত্র। ব্যক্তিগভাবে মিন অং হ্লাইং এমন চাল দিয়েছেন, সামরিক-বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর ক্ষমতার বলয় নিশ্চিন্ত ও নিশ্ছিদ্র হয়েছে। বাংলা প্রবাদকে আশ্রয় করে বলা যায়, ‘নতুন’ প্রেসিডেন্টের পুরোনো চালই ভাতে বেড়েছে মাত্র।
প্রশ্ন হচ্ছে, সবেধন নীলমণি দুই প্রতিবেশীর একটির রাজনৈতিক এই পরিবর্তনে বাংলাদেশের করণীয় কী? মিয়ানমারের বাকি প্রতিবেশীরা কী করছে? অনুমিতভাবেই বেইজিং নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে সবার আগে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সাম্প্রতিককালে যখনই বেকায়দায় পড়েছে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ও রণাঙ্গনে পাশে পেয়েছে চীন ও রাশিয়াকে। অভিনন্দন জানানোর ক্ষেত্রেও ব্যত্য়য় ঘটেনি, বরং যুক্ত হয়েছে বেলারুশ। বাকি দেশগুলো, বিশেষত ভারতের অভিনন্দন বার্তা এই নিবন্ধ রচনাকাল পর্যন্ত দেখা যায়নি। অপরদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, জান্তা হিসেবে জেনারেল হ্লাইং যেসব আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেগুলোর জবাবদিহি থেকে রক্ষা পাওয়া উচিত হবে না।
মিয়ানমারের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের কৌশল লক্ষণীয়। তারা যেমন সামরিক জান্তার সমালোচনা করেনি, তেমনই রাখাইন ও চিন স্টেটের বিদ্রোহীদের সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই কৌশল কাজে দেওয়ার কথা ছিল না। কারণ, রাখাইন ও চিন স্টেট যেখানে ভারতের জন্য বাণিজ্য ও খনিজ সম্পদের জন্য সম্ভাবনাময়; সেখানে বাংলাদেশের জন্য ১৪-১৫ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু প্রত্যাবাসনের সংকট। সম্ভাবনা বনাম সংকট নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক কৌশল কি কখনও সমান হতে পারে?
মুশকিল হলো, রাখাইন পরিস্থিতি হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের জন্য শাঁখের করাত; যেমন সামরিক জান্তা, তেমনই আরাকান আর্মিকে ভরসা করা কঠিন। যে পক্ষ যখনই বেকায়দায় পড়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে মিষ্টি কথা শুনিয়েছে। রাখাইনে ক্ষমতাশালী হওয়ামাত্রই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। এমনকি অং সান সু চিও রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশ তো বটেই, তাঁর পশ্চিমা পৃষ্ঠপোষকদেরও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন নির্বিকার চিত্তে। খোদ রোহিঙ্গারা গত সাড়ে সাত দশক ধরে জীবন, সম্ভ্রম, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে দুই পক্ষকেই চিনেছে।
মিয়ানমার বিষয়ে সর্বশেষ নিবন্ধে বলেছিলাম, ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সুবিধাও রয়েছে। যেমন আরাকান আর্মি, তেমনই মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাখাইনে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রশ্নে বাংলাদেশই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। কারণ, রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নেই। রাখাইন প্রশ্নে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র– যারাই যে অবস্থান গ্রহণ করুক; বাংলাদেশই একমাত্র ভৌগোলিক করিডোর (‘বেপরোয়া’ আরাকান আর্মি সামলাব কীভাবে, সমকাল, ৯ নভেম্বর ২০২৫)।
কথা হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক এই খেলাটা বাংলাদেশকে নিয়মিত ও নৈপুণ্যের সঙ্গে খেলতে হবে। ‘ঈদের পর’ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর আশাবাদ ব্যক্ত করার মতো বৈঠকি আলাপ করে লাভ নেই। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বেসামরিক পোশাক পরার পর ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে মাত্র। খেলা পুরোনো নিয়মেই চলবে।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
