ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

হরমুজ অবরোধ উপসাগরীয় সরবরাহ ব্যবস্থার বাঁক বদল করছে

হরমুজ অবরোধ উপসাগরীয় সরবরাহ ব্যবস্থার বাঁক বদল করছে
×

হরমুজ প্রণালী

দামিয়ানা বাকার্ডঝিয়েভা

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৫২

আবুধাবিতে অবস্থিত আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমির জন্য ‘গালফ ইকোনমিক ডিপ্লোমেসি আপডে’-এর মার্চ সংখ্যাটি প্রস্তুতকালে আমার জন্মভিটে বুলগেরিয়ার একটি লোককথার কথা মনে পড়ে গেল। লোককথাটির মোটামুটি তর্জমা দাঁড়ায় ‘কষ্টের শিক্ষা’। দুই তরুণ ভাইকে বাবাকে সহযোগিতা করার জন্য গরুর গাড়িতে করে কাঠ আনতে যেতে হয়। যাওয়ার আগে তারা বাবাকে জিজ্ঞেস করে, প্রায়ই গাড়িটা ভেঙে যায়, যদি এবার এমন কিছু ঘটে তাহলে কী করতে হবে? বাবা তাদের সহজভাবে বলেন, ‘কষ্টের মুখোমুখি হও; এই অভিজ্ঞতাই তোমাদের শক্তিশালী করে তুলবে।’ 

ফেরার পথে তাদের গাড়িটি ভেঙে যায় এবং তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাহায্যের জন্য আকুল আবেদন করতে থাকে। অন্য কোথাও থেকে সাহায্য আসবে না বুঝতে পেরে, শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরাই গাড়িটি মেরামত করে নেয়। এখন মনে হচ্ছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন এবং একে অপরকে সমর্থন করতে দৃঢ়প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রথম ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঠিক এক দিন পর উভয় দেশই ওমান, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতকে সঙ্গে নিয়ে এই কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে যৌথ বিবৃতি জারি করে।

গাল্ফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) অন্তর্ভুক্ত ছয়টি রাষ্ট্র ‘ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে আত্মরক্ষার’ অধিকারের ওপর জোর দিয়েছে। এরপর থেকে নেতা, মন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় আলোচনায় একটি বিষয় জোরালোভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। সেটি হলো, অভূতপূর্ব প্রতিকূলতার মুখে সংহতিই একমাত্র কার্যকর পন্থা।

শুধু কথার কথা নয়, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো একে অপরের সরবরাহ কেন্দ্রগুলোকে সমর্থন করার জন্য দ্রুত বিভিন্ন কৌশল হাতে নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে ইরান কার্যকরভাবে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনকে তেল, গ্যাস, সার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য রপ্তানির ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেছে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাত তার পূর্ব উপকূলের বাইপাস পাইপলাইন এবং ফুজাইরাহ বন্দর ব্যবহার করে এই বাধা আংশিকভাবে এড়ানোর চেষ্টা করছে, যদিও সেই বন্দরও লক্ষ্যবস্তু ছিল। কেবল ওমান ও সৌদি আরব প্রণালির যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রয়েছে এবং উভয় দেশই একে অপরকে সমর্থন জানাচ্ছে।

১৪ মার্চ ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সমুদ্র ও আকাশপথে পণ্য পরিবহনের জন্য একটি ‘গ্রিন করিডোর’ চালু করেছে। দুবাই ও ওমানের শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত প্রকল্পটি নির্ধারিত কার্গো কনটেইনারগুলোকে ওমানের মধ্য দিয়ে দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিবহনের সুযোগ করে দেবে। যুদ্ধের কারণে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরগামী কার্গো ওমানের বন্দর ও বিমানবন্দরে পাঠানো হচ্ছে। 

২২ মার্চ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আরও একটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি বন্দর কর্তৃপক্ষ (মাওয়ানি) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের লজিস্টিকস অপারেটর গুলফটেইনার চাজা ড্রাই পোর্টের মধ্য দিয়ে শারজাহর খোরফাক্কান কমার্শিয়াল টার্মিনাল ও দাম্মাম বন্দরের মধ্যে একটি সংযোগ চালু করেছে।

এই উদ্যোগের লক্ষ্য পণ্য পরিবহনে গতি বাড়ানো, সড়ক ও সামুদ্রিক পরিবহনের সমন্বয় সাধন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন এবং পণ্যের আরও কার্যকর প্রবাহ নিশ্চিত করা। ২৫ মার্চ লোহিত সাগরের ক্রমবর্ধমান পণ্য চাহিদা মেটাতে আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড সৌদি আরবের জেদ্দা ইসলামিক বন্দরে তিনটি নতুন আলট্রা-হেভি-লিফট ক্রেন স্থাপন করেছে।

একই দিনে মাওয়ানি ‘গালফ শাটল’ নামে একটি সামুদ্রিক পরিষেবাও চালু করে। সুইস মালবাহী সংস্থা এমএসসি এই পরিষেবার দায়িত্বে রয়েছে, যা দাম্মামের কিং আব্দুল আজিজ বন্দরকে বাহরাইনের খলিফা বিন সালমান বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। তা ছাড়া তিন হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গালফ শাটল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বাহরাইনের সঙ্গে বাণিজ্য প্রবাহকে সহজতর করে।

২৭ মার্চ সৌদি আরব রেলওয়ে কনটেইনার পরিবহন সহজতর করতে এবং ট্রানজিট সময় কমাতে দাম্মাম, ইয়ানবু ও জুবাইলের সৌদি বন্দরগুলোর সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক লজিস্টিক করিডোর চালু করেছে, যা জর্ডান সীমান্তবর্তী আল-হাদিথা বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত। 

এই সংযোগগুলো শুধু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলকেই জোরদার করছে এমন নয়, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান লজিস্টিক একীভূতকরণকেও তুলে ধরে। পরিবহন করিডোরগুলো কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়; যখন প্রতিবন্ধকতাগুলো অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করার হুমকি দেয়, তখন এগুলোই হয়ে ওঠে প্রকৃত চালিকাশক্তি।

অনিচ্ছাকৃত হলেও উপসাগরীয় অবকাঠামোর ওপর ইরানের হামলা একটি নতুন আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বিকল্প করিডোর, বহুমুখী মডেলে অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং দ্বিপক্ষীয় শুল্ক সহযোগিতা। যদিও এই কাঠামোর উপাদানগুলো বেশ কিছুদিন ধরেই গড়ে উঠছিল, এখন সেগুলোর গতি বাড়ানো হচ্ছে এবং বর্তমান সংকট নিরসনের পরেও তা বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

দামিয়ানা বাকার্ডঝিয়েভা: আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমিতে অর্থনৈতিক কূটনীতির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো; এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম


 

আরও পড়ুন

×