সমকালীন প্রস্গ
সংশয়ে সংস্কার এবং বিচার, গুম ও দুদকের ভাগ্য
জাতীয় সংসদ ভবন
মো. মাহবুবুর রহমান
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৪০
বহুল আকাঙ্ক্ষিত একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ কাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, আইনি সংস্কারের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি তাকে আজ গভীর সংশয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের অংশ হিসেবে জনগণের প্রত্যাশার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে পরিবর্তনের শুভ সূচনা শুরু করেছিল।কিন্তু সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে সেই পদক্ষেপ যেন আজ চোরাবালিতে আটকে যাচ্ছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অধিকাংশ টিকে গেলেও, রাষ্ট্র মেরামতের জন্য অপরিহার্য মৌলিক অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা স্থগিতের তালিকায়—যা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয় বরং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ওপর এক বড় আঘাত।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিতের যে সাহসী পদক্ষেপ সরকার নিয়েছিল, তা এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্ষমতার পুরনো আবর্তে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংস্কার যখন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে আর প্রয়োগের বেলা শৃঙ্খলিত হয়, তখন তাকে পরিবর্তন নয়—বরং সুকৌশলী 'পশ্চাদপসরণ' বলাই সংগত।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে পাস হয়েছে, ১৫টি সংশোধনসহ পাস হয়েছে।কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি সম্পূর্ণ বাতিল এবং ১৬টিকে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ করে স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি।
সরাসরি বাতিলের সুপারিশ হয়েছে চারটি অধ্যাদেশ। এরমধ্যে তিনটি সুপ্রিম কোর্ট–সংক্রান্ত। যেগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচারিক পদ সৃষ্টি এবং প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের অধীনস্ত বাজেট কর্তৃত্বসহ নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা বিষয়ে ক্ষমতা প্রদানের জন্য। সংবিধান অনুযায়ী বিচারক নিয়োগের বিষয়টি আইনসাপেক্ষ করাটা জরুরি ছিল, যা অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো করেছিল। এখন সেগুলো বাতিল করা মানে বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার উদ্যোগকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। ফলে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা আবার সরকারের হাতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ১৬টি অধ্যাদেশকে মেয়াদোত্তীর্ণ করে স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও দুদক আইনের সংশোধনী এবং তথ্যের অধিকার আইন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে মেয়াদোত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত। এতে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকার যে যুক্তি দেখিয়েছে, তা উদ্বেগজনক ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত বা গ্রেপ্তারের জন্য সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে’। যদি গুমের অভিযোগ ওঠে কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে, তাহলে তদন্তের অনুমতি চাইতে হবে খোদ সেই সরকারের কাছে—যারা ওই বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার পরিবারগুলো ঠিক এই কারণেই ন্যায়বিচার পায়নি।
এখন একই ফাঁদ আবার পাতা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; সেই আইন কার্যকরের প্রক্রিয়ায় সরকারের হাত বেঁধে দিলে আইনটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমান সুপারিশ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগ তদন্তের আগে সরকারের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হবে। এটি স্পষ্টতই বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সরাসরি লঙ্ঘন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সরকার নিজেকে ‘অনুমতিদাতা’ বানিয়ে বসলে রাষ্ট্র আর রক্ষক থাকে না—হয়ে যায় নিপীড়কের ঢাল। তাহলে ‘আইনের চোখে সবাই সমান’—এই নীতি কোথায় থাকে? আইন তখন ক্ষমতাধারীদের চোখে চশমা মাত্র। ফলে গুমের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ নাগরিক কখনো সুষ্ঠু বিচার পাবে না।
দুদক আইনের সংশোধনী এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের সংশোধনীকে মেয়াদোত্তীর্ণ করা দুর্নীতিবাজ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের স্বস্তি দেওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তথ্যের অধিকার আইনকে স্থগিত রাখা স্বচ্ছতার শত্রু—জনগণকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা। বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের সভ্যগণ সতর্কতামূলক মতামত ব্যক্ত করেছেন, সুপ্রিম কোর্ট সংস্কার–সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করলে বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার উদ্যোগ ব্যাহত হবে। আর ১৬টি অধ্যাদেশ আটকে রাখলে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়বে। এই সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক বিভক্তি আরও গভীর করবে এবং সংস্কার ইস্যুকে আগামী দিনে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে।
এই পরিস্থিতিতে নীরবতা পালন করা যাবে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজকে এখনই সোচ্চার হতে হবে। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে তা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরম বিধ্বংসী আঘাত হবে।
এই সিদ্ধান্ত সংস্কারের ছদ্মবেশে পুরনো ক্ষমতার সংস্কৃতিকে রক্ষা করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করছে, গুমের শাস্তি দুর্বল করছে, দুদক ও মানবাধিকার কমিশন কার্যকর নয়, তথ্য অধিকার আইন আটকে রয়েছে—এভাবে সরকার কার্যত নিজেকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থাপন করছে। আইন যদি ক্ষমতাধারীদের হাতিয়ার হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার ও অধিকার চিরতরে বিপন্ন হয়ে পড়বে। জনগণের দাবি স্পষ্ট—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ, গুম প্রতিরোধ, দুদক শক্তিশালীকরণ এবং তথ্য অধিকার আইনকে কোনোভাবেই দুর্বল করা যাবে না। এগুলোকে দুর্বল করা মানে নাগরিকের অধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক স্বপ্নের ওপর সরাসরি আঘাত।
পরিশেষে স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি, রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, দল বা বাহিনীর নয়। রাষ্ট্র প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের সম্মিলিত অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার বাহন। যদি গুমের মতো গুরুতর অপরাধের তদন্তের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির বিধান পুনঃপ্রবর্তন করা হয়, তবে তা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে ক্ষুন্ন করবে এবং দায়মুক্তির পুরোনো সংস্কৃতিকে আরও শক্ত ভিত্তি দেবে।
একইভাবে বিচার বিভাগকে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন থেকে বঞ্চিত করা মানে তাকে আবার নির্বাহী ক্ষমতার ওপর অতিনির্ভরশীল করে তোলা—যা ক্ষমতার বিভাজনের মূলনীতির পরিপন্থী। আমরা কি বারবার একই সংকটময় চক্রে ফিরে যেতে চাই? যে ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন উত্থাপিত হয়েছিল, সেই স্বপ্নের মর্যাদা রক্ষা করা আজ নীতিনির্ধারকদের নৈতিক দায়িত্ব। সংস্কারের নামে যদি কেবল পুরোনো কাঠামোকেই নতুনভাবে টিকিয়ে রাখা হয়, তবে তা জনগণের আশা পূরণ করবে না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাকে দুর্বল করে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
মো. মাহবুবুর রহমান: সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ
[email protected]
