ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

তাল পাকিলেই কেবল ধপ করিয়া পড়ে

তাল পাকিলেই কেবল ধপ করিয়া পড়ে
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৮ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৩টি অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। সংবিধান অনুযায়ী ১০ এপ্রিলের মধ্যে কোনো অধ্যাদেশ সংসদ অনুমোদন না করলে সেটি কার্যকারিতা হারাবে। বিশেষ কমিটি অনুমোদিত ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল ও ১৬টি এখনই সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করবার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে। এই তালিকায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, দুদক আইন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত জরুরি অধ্যাদেশ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে বলেছেন, ‘বিএনপি বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু সার্বভৌম বিচার বিভাগ চান না। কারণ, সার্বভৌম হলো জনগণ, সংসদ ও দেশ। এর বাইরে কারও সার্বভৌম কর্তৃত্ব থাকতে পারে না।’ (সমকাল, ৫ এপ্রিল ২০২৬)। 

এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে দীর্ঘ বিরোধ অমীমাংসিত রয়ে যাচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে; দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকারও রয়েছে। দুদক ও মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে পরবর্তী সময়ে আইন করার প্রতিশ্রুতি বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। 
আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, গুম আইনে সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছরের কারাদণ্ড; মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই। নানা আইনি ফাঁকফোকরও রয়েছে বলে বলা হচ্ছে। বিএনপি কবে বিচার বিভাগ, দুদক ও গুম সংক্রান্ত শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করবে, সেই অপেক্ষায় না থেকে আপাতত চলতি অধ্যাদেশগুলোই কেন পাস করে নিল না? পরবর্তী সময়ে সংশোধন করে আরও কঠোর আইন নিশ্চয়ই প্রণয়ন করা যেত; এখন অধ্যাদেশ না থাকায় অন্তত গুম বলে রাষ্ট্রে আর কিছুর অস্তিত্বই থাকছে না! 

গুম অধ্যাদেশ বাতিলের কারণ প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে, এর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর মতো সংবেদনশীল বাহিনীর কর্মীরা জড়িত থাকতে পারেন! এর মানে কী? আওয়ামী লীগ শাসনামলে যে বিচারহীনতার মধ্য দিয়ে গেছেন বিএনপিসহ সকল বিরোধী দলের নেতাকর্মী; সে থেকে তারা শিক্ষা নেবেন না? কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়– সংবিধানের এই মৌল ধারণা থেকে মানবাধিকার কমিশন ও গুম অধ্যাদেশের বিরোধিতা করবার যুক্তি মেলে না। আরও ‘কঠোর আইন হতে হবে’ বিবেচনায় মৌলিক আইন বাতিল করে দিলাম! এই বার্তা কর্তৃত্ববাদী আচরণের ইঙ্গিতবাহী। নবনির্বাচিত সরকারের কাছে তা প্রত্যাশিত নয়।

২.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সংবিধানে ধারণ করা হবে বলে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ ৫ এপ্রিল সংসদে বলেছেন, ‘কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। একাত্তর এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান কেন অনেকের ভালো লাগে না, তা তারা বোঝেন। কারণ সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় অর্জন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সবই এক কাতারে গাঁথা। এটা কারও কারও জন্য পরাজয়ের গ্লানি হতে পারে।’ (প্রথম আলো, ৬ এপ্রিল, ২৬)। 

ইতিহাসের অনিবার্য সত্য আংশিক হতে পারে না। যে তালিকা সালাহউদ্দিন আহমেদ দিয়েছেন; তার সঙ্গে আরও যুক্ত হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তাঁর পক্ষ থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান।

আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের সব কৃতিত্ব আপন দলের নেতাকর্মীর মধ্যে ভাগ করে নিতে চেয়েছে বলে বিএনপিকেও তা-ই করতে হবে– রাজনীতির এই পুরোনো কূটচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্বয়ং জিয়াউর রহমান তাঁর ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধে লিখেছেন– ‘পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতেও বাঙ্গালী অফিসারদের আনুগত্য ছিল না প্রশ্নাতীত।... আমাদের ওরা দাবিয়ে রাখতো, অবহেলা করতো, অসম্মান করতো।... আখ্যায়িত করতো আমাদের– আওয়ামী লীগের দালাল বলে।... উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো– আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।...৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম।’ (প্রথম প্রকাশ: দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ, ১৯৭২)। 

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণকে বাতিলের খাতায় তুলেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, বঙ্গবন্ধু নিয়ে নানা কুতর্কের অবতারণা করেছিল। অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়িয়ে, বঙ্গবন্ধুকে সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে রেখে যথার্থ শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতির উদ্যোগ বিএনপিকে ইতিহাসে অনন্য স্থান দেবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাঙা, মাজার ভাঙা, ছায়ানট-উদীচী ও সংবাদমাধ্যমে হামলার ঘটনায় অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্তত ৫০ জন আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্য সরকারি দলের আমন্ত্রণে ৫ এপ্রিল সংসদের গ্যালারিতে এসে অধিবেশন দেখছিলেন। বিরতির এক পর্যায়ে বিরোধী জোটের দুই সংসদ সদস্য সমবেত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ বিষয়টি সম্পর্কে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষে পরে সাংবাদিকদের কাছেও অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী হতাহতদের নিয়ে বিগত ২০ মাসের দুরভিসন্ধিমূলক রাজনীতি অব্যাহত রাখতে চাইছে কোনো কোনো পক্ষ; নিত্যনতুন কৌশলের বদলে এ ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী পক্ষের সুস্পষ্ট অবস্থান– দেশের স্বার্থেই জরুরি। 

৩.
জামায়াত-এনসিপির বিরোধী জোটের দাবি, তারা সংবিধানের সেই পরিবর্তনগুলো চায়, যেগুলো ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদের জন্ম দিয়েছে। এ জন্য তারা নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া জুলাই সনদের সব মূল প্রস্তাব পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে।

এই দাবির ভেতরে এক নিগূঢ় সত্য রয়েছে। ৫৪ বছরে বারবার ফ্যাসিবাদ জন্মের অন্যতম কারণ, বিরোধী দল ও মতকে নির্বিচারে সমাজ ও রাজনীতির বাইরে রাখতে স্বৈরাচারী আইনের প্রয়োগ। এই কর্তৃত্ববাদী আচরণ আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগের শেষ দেড় দশকে। চলতি সংসদ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ’কে আইনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। শাস্তির বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপি বলেছিল, তারা নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নয়। এ বিষয়ে জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে। 

কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করবার ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী জোট একই সুরে কথা বলছে। এখানে জনগণের সিদ্ধান্তের অবকাশ আর থাকছে না। সংসদে কোনো সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়, সেটি গণতন্ত্রের জন্য স্বস্তির সংবাদ নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘পুনর্লিখিত সংবিধান, নতুন সংবিধান, গণপরিষদ– এগুলো একই কথা। সংবিধানে যা কিছু গ্রহণ করতে চাই, তা সংবিধানে আনি। তাল ধপ করিয়া পড়িল, নাকি পড়িয়া ধপ করিল– একই কথা।’
তবে ধপ যখনই করুক না কেন, তালকে গাছ থেকে আপন শক্তিতে পড়তে হলে আগে পাকতে হয়। অপরিপক্ব তাল জোর করে পড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রাজনৈতিক দলকে আইনের মারপ্যাঁচে নিষিদ্ধ করবার উদ্যোগ অপরিপক্ব তাল পাড়ার মতো। এই সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই থাকা উচিত।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×