ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জ্বালানি সংকট

কৃচ্ছ্রের কৌশল ও সৎসাহস জরুরি

কৃচ্ছ্রের কৌশল ও সৎসাহস জরুরি
×

শামসুল হুদা

শামসুল হুদা

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের মধ্য দিয়ে সূচিত যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, যাদের অধিকাংশই নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিক, নারী ও শিশু। ইরানের পাশাপাশি লেবাননেও নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সহায়-সম্পদ, ঘর-বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল। মার্কিন ঘাঁটি ও বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশিও প্রাণ হারিয়েছেন। মাত্রাগত দিক থেকে কম হলেও ইসরায়েল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যুদ্ধটাকে বাহ্যত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে মনে করা হলেও বাস্তবে এটি আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এর ফলে যে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোকে প্রবলভাবে নাড়া দিচ্ছে। কারণ ছোট-বড় সকল দেশই অর্থনীতি সচল রাখতে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর সবচেয়ে বড় উৎস ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। বাংলাদেশের কৃষি-শিল্পসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তাই সংকটের মুখে। শুধু আমাদের দেশ নয়; বিশ্ব অর্থনীতিই এ যুদ্ধের কারণে অদূর ভবিষ্যতে আরও একটি বড় মন্দার দ্বারপ্রান্তে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের দেশের সরকার, বৃহৎ ব্যবসায়ী-শিল্পপতি গোষ্ঠী, পেশাজীবী, চাকরিজীবী, শীর্ষ আমলাগোষ্ঠী, রাজনীতিবিদ, সাধারণ নাগরিকদের জাতীয়ভাবে করণীয় কী?
আমাদের প্রত্যেকের পেশাগত বা ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে কিছু ভূমিকা ও দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন এজেন্সি, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, শিল্পপতির দায়িত্ব নিঃসন্দেহে বেশি। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের দায়িত্বও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সে ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি সর্বস্তরে জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া। লোক দেখানো উদ্যোগ নয়। এ চর্চা হতে হবে নিজের অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন।
অতীতেও আমরা জাতীয় সংকটের মুখোমুখি হয়েছি। সেগুলো মোকাবিলার মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা এবারের সংকট থেকে উত্তরণেও প্রাসঙ্গিক। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আমাদের প্রধান শক্তি ছিল সুকঠিন জাতীয় ঐক্য এবং দৃঢ়পণ সংকল্প। স্বাধীনতার পর সেই ঐক্য আমরা ধরে রাখতে পারিনি। প্রধানত তখনকার শাসক শ্রেণির অঙ্গীকারের ঘাটতি এবং আমলা ও উঠতি ধনিক শ্রেণির বাসনার কারণে। 

এবারও জ্বালানি সংকটের মুখে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশ যখন জরুরি, তখনই এক শ্রেণির মজুতদার জ্বালানির গোপন মজুত গড়ে তুলছে অতি মুনাফার লোভে। আরেক দল পয়সাওয়ালা কাল পেট্রোল-ডিজেল পাবে কিনা– সে আশঙ্কাই আজই যত পারে কিনে নিয়ে মাটির নিচে, পানির ট্যাঙ্কে জমা রাখছে। বলা বাহুল্য, তারা কেউ দরিদ্র, নিরক্ষর মানুষ নয়। অধিকাংশই তথাকথিত শিক্ষিত ও বিত্তবান।
দেশে যত সংকট সৃষ্টি হয়েছে; লাখো-কোটি টাকার সম্পদ, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট ও বিদেশে পাচার হয়েছে তার জন্য এই শ্রেণির লোকই দায়ী। আমরা সবাই জানি। দুর্ভাগ্য, এরা থেকে যায় সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে; আইনি পদক্ষেপ ও বিচারের ঊর্ধ্বে।

বর্তমান সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকারে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাতে এমন সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি শক্ত হাতে বন্ধ করার কথাই রয়েছে। সরকারকে তাই কঠিন হলেও কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। সামনে জাতীয় বাজেট প্রণয়নের চ্যালেঞ্জও মনে রাখতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে–

১. জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ, দোকানপাট, শপিংমলের কর্মঘণ্টা ও সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে। কাঠোর মনিটরিং থাকতে হবে। 

২. জ্বালানি তেল নিয়ে অব্যবস্থাপনা, মজুতদারি, অতি মুনাফার লোভে দুর্নীতি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা যে কোনো মূল্যে রোধ করতে হবে। গাড়ি, জিপ, বাস, মিনিবাস, ট্রাক ইত্যাদির জ্বালানি সরবরাহের নিয়ম হিসেবে ব্লু বুক বা লাইসেন্সভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা দরকার। জ্বালানি তেলের ডিপোগুলোকে একটা নেটওয়ার্কের আওতায় এনে দ্রুত এক অ্যাপসের মাধ্যমে তেল সরবরাহ ব্যবস্থা মনিটর করতে হবে, যাতে কেউ মজুতদারি অথবা অন্য কোনো ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নিতে না পারে। 

৩. কৃষকদের সেচ পাম্প, মাছ ধরা ট্রলার, কৃষিজাত ফসল যেমন আলু হিমাগারে রাখতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আলাদা কার্ড কিংবা নিবন্ধন নম্বর দিয়ে তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দিতে হবে। যে কোনো অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থা থাকতে হবে। 

৪. সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংকসহ সকল প্রতিষ্ঠানে জ্বালানির ব্যবহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। তার জন্য সকলের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে। তবে অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। তবে তাদের যানবাহনেও জ্বালানির জন্য লাইসেন্সভিত্তিক অ্যাপস ব্যবহার জরুরি। 
৫. যেহেতু সংসদের সামনের অধিবেশনেই সরকারকে জাতীয় বাজেট পেশ করতে হবে। তার জন্য এখনই প্রস্তুতি নিয়ে সরকারসহ সকলকে ভাবতে হবে। কোনো বাহুল্য খরচ বাজেটে রাখা যাবে না। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ খাত এর ব্যতিক্রম বলে গণ্য হতে পারে। 

৬. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি অটুট রাখাও জরুরি। নির্বাচিত বিএনপি সরকার তাদের ৩১ দফা কর্মসূচি এবং নির্বাচনী ইশতেহারে যে সকল আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপির কর্মসূচি ও ইশতেহারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ বলবৎ করেছিল তার মধ্যে বিশেষভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, স্বতন্ত্র সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয়, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি দমন কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং তথ্য অধিকার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ এই সংসদ অধিবেশনেই পাস হওয়া কাম্য।

শামসুল হুদা: মানবাধিকারকর্মী; নির্বাহী পরিচালক এএলআরডি

আরও পড়ুন

×