মানবাধিকার
আসামি বানানোর রাজনীতি আর কতদিন চলবে
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় ‘গায়েবি মামলা’ একসময় বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, ঘটনা ঘটার আগে কিংবা ঘটনার সঙ্গে বাস্তবিক কোনো সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে মামলা দায়ের করা হতো। এর ফলে বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি–ন্যায়বিচার, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত এবং ব্যক্তিগত দায়– এসব নীতির ওপর আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। তখনকার সরকার এ ধরনের অভিযোগকে আমলে না নিয়ে বরং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করার মাধ্যমে একটি দমনমূলক পরিবেশকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রত্যাশা ছিল– এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক ও বিচারব্যবস্থায় একটি গুণগত রূপান্তর ঘটবে। অতীতের অন্যায় ও অপব্যবহারের সংশোধন হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, মামলার প্রকৃতি আংশিকভাবে পরিবর্তিত হলেও মৌলিক সমস্যাগুলো বহুলাংশে বহাল রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষণীয়। আগের সময়ের অনেক মামলাই ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা ‘গায়েবি’ অভিযোগনির্ভর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ ঘটনায় বাস্তব ঘটনার ভিত্তি রয়েছে। অর্থাৎ কোনো না কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে; ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটি সৃষ্টি হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে। অভিযোগ উঠছে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত না করে বা পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ না করেই রাজনৈতিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত কারণে বহু মানুষকে মামলায় আসামি করা হয়েছে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিকে অপরাধের জন্য দায়ী করতে হলে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট, প্রমাণযোগ্য সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। কিন্তু যখন একটি মামলায় নির্বিচারে বহুজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন এই নীতিটি লঙ্ঘিত হয়। এর ফলে বিচার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায় এবং নিরপরাধ ব্যক্তিরা অযাচিত হয়রানির শিকার হন।
প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের পরিস্থিতি দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর। প্রথমত, যারা প্রকৃত ভুক্তভোগী তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা কমে যায়। কারণ তদন্ত যখন বিস্তৃত ও অসংলগ্ন হয়ে পড়ে, তখন প্রমাণের মান ও গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হয়ে যায়। আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকৃত অপরাধীরাও শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যারা নির্দোষ তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নে রূপ নেয়। গ্রেপ্তার, রিমান্ড, আদালতে হাজিরা, সামাজিক বিড়ম্বনা– সব মিলিয়ে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জীবনে এর প্রভাব হয় গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পেশাগত জীবন, সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি কেবল ব্যক্তির নয়, বরং তার পরিবার ও সামাজিক পরিসরের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে, বাংলাদেশ কি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে? আইনগতভাবে এ সমস্যার সমাধানে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মামলার এজাহার গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া থাকতে হবে, যাতে ভিত্তিহীন বা অতিরঞ্জিত অভিযোগ সহজে গ্রহণ না করা হয়। দ্বিতীয়ত, তদন্ত সংস্থাগুলোর পেশাগত দক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করতে পারেন। তৃতীয়ত, মিথ্যা মামলা বা হয়রানিমূলক অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই বাদীর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের বৈধতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার বিচারব্যবস্থা ও জনগণের আস্থার ওপর। যখন জনগণ মনে করে– আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা কমে যায়। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং রাজনৈতিক মেরূকরণ আরও তীব্র হয়।
এ ছাড়া এ ধরনের হয়রানিমূলক মামলার সংস্কৃতি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা একটি অসম ও অন্যায্য খেলায় পরিণত হয়, যেখানে আইনের শাসনের পরিবর্তে ক্ষমতার প্রভাবই প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে।
সবশেষে বলা যায়, নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি কেবল একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। একটি সভ্য সমাজে আইন কখনোই আতঙ্কের উৎস হতে পারে না। বরং এটি হওয়া উচিত ন্যায়বিচার ও সুরক্ষার প্রতীক।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে তাকে এই হয়রানিমূলক মামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে না এবং ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর স্থায়ী অন্ধকার ছায়া হয়ে থেকেই যাবে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- মানবাধিকার
