ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জ্বালানি সংকট

সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে দীর্ঘমেয়াদি যে প্রস্তুতি দরকার

সাময়িক যুদ্ধবিরতির সময়ে দীর্ঘমেয়াদি যে প্রস্তুতি দরকার
×

কাজী মারুফুল ইসলাম

কাজী মারুফুল ইসলাম

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাত শেষে ইসরায়েলসহ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে পুরো বিশ্বের জন্য স্বস্তির বার্তা। এই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক কোনো ঘটনা ছিল না; বরং এর অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে শ্রমবাজার, জ্বালানি সরবরাহ– সবখানেই প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ এ ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী- সে বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

এটি ছিল একটি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ, যেখানে বৃহৎ শক্তির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ছোট ও মাঝারি শক্তিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে ইসরায়েলের অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধ করেছে। এ ধরনের সংঘাতের ভয়াবহ দিক হলো, এতে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি, যারা সরাসরি কোনো যুদ্ধের অংশ নয়।

এ চুক্তিতে বিশেষত জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে ইরানের উত্থাপিত শর্তগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হলে শান্তিচুক্তি কতটা কার্যকর হবে– তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করা, একই সঙ্গে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা না চালানো ইত্যাদি  শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে ইরান।

অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার অঙ্গীকার একটি ইতিবাচক দিক, যদি তা বাস্তবে কার্যকর হয়। শান্তিচুক্তির সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আন্তরিকতা, আস্থার পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের ওপর। সর্বোপরি এ চুক্তি যুদ্ধবিরতির সূচনা হলেও স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেন মধ্যপ্রাচ্য আরেকটি সংঘাতের দিকে না এগোয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হলো, এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ, বিশেষ করে লেবানন ও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তি না থাকা। এই বাস্তবতায় লেবাননকে আলোচনার বাইরে রাখলে স্থল পর্যায়ে সংঘাতের পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যায়। একইভাবে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে যদি চুক্তির কাঠামোর ভেতরে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত না করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে একতরফা সামরিক প্রতিক্রিয়ার পথ খুলে দিতে পারে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতৃত্বের ভূমিকা বিবেচনায় নিলে এই চুক্তির স্থায়িত্ব কতটা নির্ভরযোগ্য? ট্রাম্পের পূর্ববর্তী পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময়ই আকস্মিক ও অসংলগ্ন সিদ্ধান্তে চিহ্নিত হয়েছে। যেমন আকস্মিকভাবে চুক্তি থেকে সরে আসা বা অবস্থান বদল। ফলে তাঁর নেতৃত্বে গৃহীত কোনো সমঝোতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে কিনা, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় তৈরি হয়। আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এই অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে নিজেদের বিকল্প কৌশল প্রস্তুত রাখবে, যা চুক্তির কার্যকারিতা দুর্বল করতে পারে।

সব মিলিয়ে চুক্তিটি তাৎক্ষণিক সংঘাত প্রশমনে সহায়ক হলেও এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা, পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগের ভারসাম্য রক্ষা এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা ছাড়া এ ধরনের সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারবে না। অন্যথায় এটি কেবল সাময়িক বিরতি হিসেবে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতেই থাকবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংঘাতের প্রভাব ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ইতোমধ্যে অন্তত সাতজন বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রেমিট্যান্সের মাধ্যমে। তাদের নিরাপত্তা শুধু মানবিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও গ্যাস সরবরাহকারী অঞ্চল। এ অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলেই তেলের দাম বাড়ে, সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো সংকটে পড়তে থাকে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, তা এই সংঘাতের একটি প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প খাতে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি– সবই এ সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দেশের অভ্যন্তরীণ কারণগুলো এখানে না-ই বা বললাম। 
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জ্বালানি খাতে আত্মনির্ভরতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, যা আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ফলে বিশ্ববাজারে কোনো অস্থিরতা দেখা দিলেই দেশের ভেতরে তার প্রভাব পড়ে।

এ প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হতে পারে কার্যকর বিকল্প। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুৎ– এসব উৎসের সম্ভাবনা বাংলাদেশে কম নয়। ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ খাতে কিছু অগ্রগতি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। সরকার ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রসার ঘটানো গেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সেই সঙ্গে শিল্প খাতেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য নীতি সহায়তা প্রয়োজন। কর ছাড়, সহজ ঋণ সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিলে উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন।
এ সংঘাত আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে বৈশ্বিক শক্তির দ্বন্দ্বে দেশটি অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে না পড়ে। সেই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় আরও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সব শেষে বলা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের সাময়িক অবসান বিশ্বকে স্বস্তি দিলেও এর অন্তর্নিহিত সংকট এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘাত আবারও ঘটতে পারে। তাই এখনই সময় বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া শুধু একটি বিকল্প নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য কৌশল, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×