ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

সাংগ্রাই উৎসবের বর্তমান রূপ কতটা কাঙ্ক্ষিত

সাংগ্রাই উৎসবের বর্তমান রূপ কতটা কাঙ্ক্ষিত
×

অংসুই মারমা

অংসুই মারমা

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৫০ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:৩৩

‘সাংগ্রাই’ বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে মারমাদের বার্ষিক উৎসব। সেই ছোটকাল থেকে দেখা। চাকমাদের ‘বিঝু’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’, সমতলের বড়ুয়া ও সনাতনী হিন্দুদের চৈত্রসংক্রান্তির সময়ে মারমারা এ সাংগ্রাই পালন করে। সহজভাবে বললে, এই চৈত্রসংক্রান্তিই সাংগ্রাই।
সেই সাংগ্রাই সময়ের হাত ধরে উপস্থিত হতে আবার কড়া নাড়ছে। উৎসবে উৎসবে পাহাড় আবার রাঙিয়ে উঠবে। তবে স্মরণাতীত কাল থেকে পালিত এ সাংগ্রাই উৎসব সময়ের নিরিখে নানা বাঁক নিয়েছে। উৎসবের ধারা বদলে গেছে পোশাক বদলের মতো। একটা সময় ধর্মীয় আচার প্রধান থাকলেও পরে সামাজিক প্রধান হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ধর্মীয় আচার সামাজিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। পুরোনো কিংবা আদি কৃষ্টির স্থলে নতুন আচার-আচরণ সংযোজিত হয়েছে। কোথায় কতটুকু পরিবর্তন ঘটেছে এ উৎসবের?

সাংগ্রাইয়ের মিথ: কয়েকটি মিথের ওপর সাংগ্রাই আবর্তিত। তবে সাধারণভাবে যেটি প্রচলিত তা হলো, এ সময়ে সাংগ্রাই মাং বা সাংগ্রাই দেবতা অর্থাৎ ইন্দ্র রাজা তাবতিংস স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে আসেন। সমাজের মানুষ অন্যায় করে কিনা, মিথ্যা বলে কিনা, মদ্যপান করে কিনা, অর্থাৎ ধর্মমতে জীবনযাপন করে কিনা– তা পর্যবেক্ষণ করেন। এ দেবতা ন্যায়-অন্যায়ের নির্ধারক। সাংগ্রাইয়ের শেষে আবার স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে বলে লোকবিশ্বাস আছে। তাই সাংগ্রাই সময়টাতে এরা মদ্যপানসহ সমাজে গর্হিত কাজ করা থেকে বিরত থাকে। সমাজ ওই সময়ে মদ্যপান অনুমোদন করে না। ধর্মভয় এখানে প্রধান ভূমিকা রাখে। অতীতে যারা এমন কাজ করেছে, এদের সামাজিক শাস্তি দেওয়ার নজিরও আছে। 
ম্রাইমা সাক্রয়: মারমাদের বর্ষপঞ্জিকে ম্রাইমা সাক্রয় বলা হয়, যা চট্টগ্রাম এলাকায় মঘীসনরূপে পরিচিত। তৎকালীন আরাকান রাজসভার কবি কাজী দৌলত, কবি আলাউল প্রমুখের সূত্রে এ সন প্রচলিত ছিল। মূলত এ সনকে কেন্দ্র করেই সমাজে সাংগ্রাইয়ের পদচারণা ও বিস্তার। মিয়ানমারের মান্ডালয়ে এক সময়ের রাজা ঘজা মাং কর্তৃক এ সন প্রবর্তিত বলে প্রকাশ। সেই হিসাবে তাঁর আরেক নাম ঘজা সাক্রয়। এ সন ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত। সুদূরের সেই অতীত থেকে চলে আসা সনকে মারমারা এখনও পালন করে। এ বর্ষপঞ্জি মিয়ানমার থেকে হপণারা (ভ্রাম্যমাণ ব্রাহ্মণ দল) মারমাদের গ্রামে গ্রামে নিয়ে আসত ও প্রচার করত। সেই বর্ষপঞ্জিতে পুরো এক বছরের পূর্বাভাস উল্লেখ থাকে। বর্তমান চলমতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মাধ্যমে এ ম্রাইমা সাক্রয় চলে আসে। জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে এরা এ সন অনুসরণ করে। নামকরণ করা হয়ও এ সনকে অবলম্বন করে।
সাংগ্রাইয়ের সময়মাত্রা: পার্বত্য চট্টগ্রামে বোমাং প্রধান এলাকা বোমাং সার্কেলে সাধারণত তিন দিন এর ব্যাপ্তি। প্রথম দিন সাংগ্রাই, এদিনে ফুল সংগ্রহ, ফুল দিয়ে বুদ্ধ বন্দনা, গৃহের তোরণে ফুল দিয়ে সাজানো এবং ক্ষেত্রবিশেষে গরুর গলায় ফুলের মালা দেওয়া ইত্যাদি। তবে ফুলটা যেনতেন নয়, বনে কেবল এ চৈত্রমাসে ফোটা সাদা রঙের বিশেষ এক ধরনের বনফুল দিয়ে সম্পন্ন করতে হয়। এটি ঐতিহ্যবাহী ফুল। পাড়াগাঁয়ে অনেকে কৌতূহলবশত সাংগ্রাই খুঁজতে বের হয়। তখন কিশোর-তরুণরা বন থেকে সংগৃহীত নজরকাড়া এ ফুলগুলো দেখিয়ে বলে, এই তো সাংগ্রাই! ওই সময় কী যে একরূপ হাসির রোল ছড়িয়ে পড়ে! সত্যি তখন সাংগ্রাই ধরা দেয়। সেদিন পড়শীদের ঘরের উঠোনে হাঁস-মুরগির জন্য শস্যদানা ছড়িয়ে দেয়, বয়স্কদের গোসল করানো হয়। দ্বিতীয় দিন অক্যা বা মূল সাংগ্রাই। এদিন নতুন কাপড় পরে বিহারে গমন ও ধর্মকাজ সম্পন্ন করে। অনেকে ‘উপোস’ পালন করে। বুদ্ধমূর্তি স্নান ইত্যাদি করা হয়। অনেকে চট্টগ্রামের মহামুনি মেলায় কিংবা কাপ্তাইয়ে চিংম্রং বিহারে তীর্থ করতে যান। সেদিন বনের ফলমূল দিয়ে পাচন রান্নাসহ উন্নত খাবারের আয়োজন ও পরিবেশন করা হয়। তৃতীয় দিন ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া খঞাং বা দহ্ আকাজা (গিলা খেলা), কাপ্যা (এক ধরনের দীর্ঘ লয়ের গান, যা কোনো বাদ্য-বাজনা ছাড়া পরিবেশন করা হয়) গাওয়া, বাঁশি বাজানো ইত্যাদির মাধ্যমে অতীতের মহান কার্যাবলিকে স্মরণ করা হয়। মারমা সমাজ মনে করে, এদিনেই সাংগ্রাই দেবতা মর্ত্য ছেড়ে স্বর্গে ফিরে যান। এ সময়ে সৎভাবে একে অপরের খোঁজখবর নিয়ে আপ্যায়নের মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা করে। এ হলো বোমাং সার্কেলের রেওয়াজ। আবার মং প্রধান মং সার্কেলের মারমাদের সাংগ্রাইয়ের সময়মাত্রা চার থেকে পাঁচ দিন। প্রথম দিন সাংগ্রাই, এদিনে আগেকার সময়ে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা হতো। এখন এসব নিয়ম মুখে আছে, কাজে নেই। দ্বিতীয় দিন অক্যা বা মূল সাংগ্রাই। তৃতীয় দিন অক্যাই। এটা এক ধরনের বিরতি। তবে পাচন রান্নার জন্য বন ও জুম থেকে নানান উপাদান সংগ্রহ করে আনা হয়। চতুর্থ দিন আতাদা। সেদিন ফাসওয়ং (পাচন) রান্নাসহ নানা মুখরোচক খাবার তৈরি করে খাওয়ানো হয়। পঞ্চম দিন অপ্যাইং বা প্রস্থান। পরের দিন রাক্ থোয়াইং বা নতুন বছরের প্রথম দিন। হিসাবমতে, এ বছর ১৬ এপ্রিল ম্রাইমা সাক্রয়ের ১৩৮৮ সালের প্রথম মাসের প্রথম দিবস। এটা অনেকটা পহেলা বৈশাখের মতো হলেও এদিন কোনো আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, গণনা হয় মাত্র। 
সার্কেলভেদে আনুষ্ঠানিকতার তারতম্য: বোমাং সার্কেল দক্ষিণাঞ্চল ও মং সার্কেল উত্তরাঞ্চল। সাংগ্রাই পালনের ক্ষেত্রে কিছু তারতম্যের বিষয়ে ওপরে আলোচনা করেছি। সাংগ্রাইয়ের আদি লোকাচারগুলো দক্ষিণাঞ্চলে মোটামুটি এখনও বলবৎ আছে। তবে উত্তরাঞ্চলে নানা রাজনৈতিক ধকলের কারণে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন ফুল তোলা বা সংগ্রহ করা আর বাধ্যগত নয়। বনের যে ফুলকে মারমারা ‘সাংগ্রাই পাঁই’ বলে, তাকে অনেকে চেনে না। এ ফুলের মাহাত্ম্য সম্পর্কে এরা তেমন জ্ঞাতও নয়। অবশ্য প্রান্তিক এলাকার কেউ কেউ এখনও চেনে। এরা একে ক্যাহ্ মুছুই (বাঘের দাঁড়ি) বলে। কিন্তু ফুলের গুরুত্ব সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞাত। অথচ এ ফুল দিয়েই সাংগ্রাইয়ের আনুষ্ঠানিকতার যাত্রা। চাকমা ও ত্রিপুরা সমাজে যথাক্রমে ফুল ভাসানো ও ফুল পূজা করতে দেখা যায় এবং অধুনা এর ব্যাপ্তি খুবই বেশি। খঞাং বা দহ্ আকাজা (গিলা খেলা): মারমাদের সাংগ্রাইয়ে এ খেলা একটি ঐতিহ্যবাহী আবশ্যিক খেলা। পৌরাণিক কাহিনি ‘থামরা জৈঃ’ (পাংখু পালা) তে বর্ণিত কুমার থামরাকে স্মরণ করে এ খেলার আয়োজন করা হয়। বর্তমান প্রজন্ম এ বিষয়ে অবগত নয়। কুমার থামরা এ গিলা খেলায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন এবং ষড়যন্ত্রমূলক বন্দি থাকা পিতা ওগা রাজাকে মুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। মারমা সমাজে এ কাহিনি বীরের প্রতীকরূপে সমাদৃত। তাই গ্রামে গ্রামে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ খেলা প্রদর্শন করা হয়। তবে খাগড়াছড়িতে প্রথম য়ংড বৌদ্ধবিহার প্রাঙ্গণে প্রয়াত চাইহ্লাউ মগ ও চাইথোঅং মারমার উদ্যোগে ১৯৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এ খঞাং খেলার আয়োজন করা হয়েছিল। এর পরের বছর থেকে মারমা উন্নয়ন সংসদ রেগুলার আয়োজন করে। 
অবশ্য এ খেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বর্তমানে বহু স্খলন ঘটেছে। অপ্রয়োজনীয়ভাবে সপ্তাহ দশ দিন ধরে চালিয়ে নেওয়া হয়। এগুলো যথেষ্ঠ ব্যয়বহুলও বটে। এ ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া আয়োজনের সময় যে বেলালাপনা নৃত্য প্রদর্শন করা হয়, তা শোভন নয়। যুব সম্প্রদায়কে এখন এ সময়ে মদ্যপান করে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়। সমাজ ও ধর্ম এ ক্ষেত্রে নির্বিকার। এ প্রতিষ্ঠানগুলো আগের পর্যায়ে আর নেই। শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা হারিয়ে ফেলেছে।

সংযোজিত নতুন আচার 
 ১.ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল: সাংগ্রাইয়ের সময়ে মারমা সমাজে ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল এখন বড় জনপ্রিয় ইভেন্ট। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে এটি আকর্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়িও এ ইভেন্ট আয়োজন করতে ভোলে না। কিন্তু মারমা সমাজে এ ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল বা পানি খেলা কখনও ছিল না। পাহাড়ে পানির অভাব সবসময়ই ছিল। সহজলভ্য ছিল না। চৈত্র মাসে আরও কঠিন। অনেক দূর থেকে খাবার পানি আনতে হয়। এ সমস্যা এখনও আছে প্রকটভাবে। বিভিন্ন স্থানে খাদ্যাভাবও দেখা দেয়। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে কীভাবে এ ‘পানি খেলা’ সামাজিকতার অংশ হয়ে গেল, তা এক অনুসন্ধানের বিষয়। যে সমাজের মানুষকে বহু কষ্টে দূর থেকে খাবার পানি আনতে হয়, তাদের সঙ্গে এক ধরনের রসিকতা কিনা– তা ভেবে দেখতে পারি। তথ্য সংগ্রহ করে যদ্দূর জানা যায়, বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর প্রথম বান্দরবানে এ পানি খেলার প্রচলন ঘটে। তারা মূলত তৎকালীন বার্মার সিতওয়ে থেকে খেলাটি আমদানি করেছিল। পরে বান্দরবান থেকে চন্দ্রঘোনায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর খাগড়াছড়িতে আয়োজন করা হয়। সম্ভবত খাগড়াছড়িতে সামাজিক সংগঠন ‘মারমা উন্নয়ন সংসদ’ প্রথম খেলাটি আয়োজন করে। যাহোক না কেন, এখন সাংগ্রাইয়ে এ খেলা ব্যাপকভাবে সমাদৃত। 
২. সাংগ্রাই গান: সাংগ্রাই উপলক্ষে গত ৫০ বছরে আড়াইশর বেশি মারমা আধুনিক গান রচিত ও গাওয়া হয়েছে। কিন্তু মৌলিক গান তেমন নেই। গানের ভাষা ও সুর দেওয়ার লোক না থাকায় এই অবস্থা! বান্দরবানের উচহ্লা ভান্তের (প্রয়াত) লেখা ও অনন্ত চৌধুরীর গাওয়া ‘সাংগ্রাইমা ঞি ঞি ঞা ঞা রি কাজাইকাই পামে’ (সাংগ্রাইয়ে সবাই মিলেমিশে এসো পানি খেলি) গানটি তিন পার্বত্য জেলায় সমান জনপ্রিয়। পানি খেলা আয়োজনের সময় এটি গাওয়া হয়। এটি সম্ভবত ১৯৭৪ সালের দিকে আঞ্চলিক বেতার কেন্দ্র, চট্টগ্রামে রেকর্ড করা হয়েছিল। অনন্ত চৌধুরীর প্রকৃত নাম অংথোয়াইচিং চৌধুরী। মৃত্যুকালে তিনি স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটিরও সদস্য ছিলেন। 
৩. সাংগ্রাই রেলি বা পদযাত্রা: খাগড়াছড়িতে ‘মারমা উন্নয়ন সংসদ’ প্রথম ১৯৮৯ সালে সাংগ্রাই উপলক্ষে এ র‍্যালি বা পদযাত্রার আয়োজন করে। এ খাগড়াছড়ি জেলা জাতিগত ডাঙার ক্ষেত্রস্থল ছিল। তখন প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ি-বাঙালির সমন্বয়ে সম্প্রীতি র‍্যালির আয়োজন করা হতো। তারই অংশ হিসেবে মারমা সংসদ এমন র‍্যালির আয়োজন করে। এখন এদের অনুষ্ঠানের বড় ইভেন্ট হলো সাংগ্রাই র‍্যালি, মৈত্রী র‍্যালি ইত্যাদি। ওই সময়ে তারা জাতিগত পোশাক পরিধান করে। এদের বেশভূষা দেখলে মনে হবে তাদের জীবনে অভাব, দুঃখ- কষ্ট কখনও স্পর্শ করেনি। বর্তমানে মারমাদের এ র‍্যালিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করেন।
৪. সামাজিক উৎসবে পরিণত: আগে ধর্মীয় আচরণ প্রধান থাকলেও এখন তা অনেকখানি বদলে গেছে। ধর্মের স্থলে এখন সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এ জন্য আধুনিকতা ও অপরাপর সমাজের সংশ্লেষণ দায়ী। যে স্থানে নাগরিক সমাজের গোড়াপত্তন ঘটেছে, যেখানে মিশ্র সমাজের উদ্ভব হয়েছে, সেখানে এমন অবস্থা প্রবল। আগে ছিল ত্যাগ ও আত্মোপলব্ধি, এখন হয়েছে ভোগপ্রবণ ও বিলাসিতার রমরমা। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গা ভাসিয়ে দেওয়া। ব্যয়বহুল আয়োজন করতে যেন সবাই মুখিয়ে থাকে। লাগাম টেনে ধরার কেউ থাকে না। 

সাংগ্রাই একটি রাশির পরিবর্তনের যুগসন্ধিক্ষণ। চিরাচরিত নিয়মে ‘পুরাতনকে বিদায় ও নতুনকে স্বাগত’ জানানো ব্যাপারটা মারমা সমাজের জন্য তা কিন্তু নয়। এর দার্শনিক গভীরতা আরও ব্যাপক। ব্যর্থতা ও গ্লানি বিশ্লেষণ করা এবং আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে ভুল শুধরে নেওয়ার চিন্তা। সর্বোপরি সমাজকে শানিত করে তোলার উপলক্ষ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যুগোপযোগী সমাজ নির্মাণ করার পথ খুঁজে নেওয়া। কিন্তু উৎসব আনন্দের নামে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের উল্লম্ফন বেশ করাল হয়ে উঠেছে। এটা এক ভয়ংকর দিক। ভাষা-কৃষ্টি বিকাশের পরিবর্তে হুমকির পথে রয়েছে। এখানে অবাঞ্ছিত অনেক কিছু অনুপ্রবেশও ঘটেছে। আমাদের সমাজে এ সময়ে ফূর্তি ও ব্যয়ের বহর যেভাবে হাজির হয়, তা কারও জন্য শুভ নয়। এটা উপলব্ধি করার সময়। উৎসবকে উচ্ছৃঙ্খল নয়, উৎসবের জায়গায় রাখা যেতে পারে। তাই আমাদের সাংগ্রাইয়ের প্রকৃত কক্ষপথে ফেরার চেষ্টা করা উচিত। নইলে উৎসবের জাঁতাকলে পড়ে পথ হারাবে পথিক!

অংসুই মারমা: সাবেক ফিল্ড সুপারিনটেনডেন্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, খাগড়াছড়ি।

আরও পড়ুন

×