উচ্চশিক্ষা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের খবরদারি এবং ইউজিসির আমলাতান্ত্রিক তদারকি
প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধু ইউজিসির সমস্যা নয় স্বয়ং আমলাতন্ত্রও এই সমস্যায় জর্জরিত
মোর্ত্তুজা আহমেদ
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:০০
একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক, রাফিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উদ্ভাবনী গবেষক, কয়েক মাস ধরে নিজের নতুন কৃষি প্রযুক্তি প্রকল্পের অনুমোদনের অপেক্ষায়। তার লক্ষ্য দেশের কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা এবং কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবতা যেন তার স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে। ফাইল এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে, স্বাক্ষরের জন্য অপেক্ষা চলছে, আর ইউজিসি যা শিক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় খবরদারি করছে, তবে কাজের গতি শূন্যে। রাফিকের গবেষণা স্থবির, উদ্ভাবন বিলম্বিত, আর সময় চলে যাচ্ছে বৃথা।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অনেক বছর ধরে দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা হলো, তাদের ক্ষমতা সীমিত। কারণ, তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে, এবং কোন পদক্ষেপ নিতে গেলে ফাইল মন্ত্রণালয়ে আটকে যায়। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউজিসির নীতিমালা কঠোরভাবে কার্যকর করা যায় না। এর ফলে, উচ্চশিক্ষার মান বজায় রাখা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণার তহবিলও বড় সমস্যার একটি। ইউজিসি যে বাজেট দেয়, তা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত কম। রাফিকের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সফটওয়্যার, এবং ক্ষেত্রপরীক্ষার ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব। তাই তার উদ্ভাবনী প্রকল্প আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। একই সময়ে, নাজমা নামের এক শিক্ষার্থী নতুন তথ্যপ্রযুক্তি কোর্সে ভর্তি হতে চেয়েছিল। কিন্তু ইউজিসির অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে কোর্সটি চালু হচ্ছে না। তার শিক্ষার সুযোগ বিলম্বিত হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে কর্মবাজারে প্রতিযোগিতা করতে সে পিছিয়ে যাবে।
শুধু তাই নয়, পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের সমতা নিশ্চিত করা এবং নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও প্রায়শই কঠিন। ইউজিসি ব্যবস্থা নিতে গেলে মন্ত্রণালয় ফাইল আটকে দেয়। ফলে ইউজিসি কোন কাজ করতে পারে না। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, শুধু নিয়ন্ত্রণ থাকা যথেষ্ট নয়, যদি তার কার্যকারিতা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকে। আবার রাজনৈতিক প্রভাবও বড় সমস্যা। নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রায়শই দেখা যায়, যা ইউজিসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি ও কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে কারিকুলাম মানিয়ে নেওয়াও অত্যন্ত ধীর। ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে যাচ্ছে।
এই কারণে অন্তর্বর্তী সরকার উচ্চ শিক্ষা কমিশন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণার তহবিল, এবং স্বায়ত্তশাসনের ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু আমলা তান্ত্রিক জটিলতার কারণে কমিশন এখনও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারই আজ বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এখানে একটি বড় ধাঁধা রয়েছে। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা কমিশনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার চেষ্টা চলছে। অনেক শিক্ষাবিদ প্রস্তাব দিচ্ছেন, কমিশনকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে আনা হোক অথবা কমিশনকে পূর্ণ সায়ত্বশাসন দেওয়া হোক। এটা একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ, আবারও যদি কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়, শুধু নামেরই পরিবর্তন হবে; কাজের ধরণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং খবরদারি আগের মতোই থাকবে। অর্থাৎ, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কোনো মূল সংস্কার না আনলে ফলাফল অপরিবর্তিত থাকবে, আর কমিশন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে ঘুরে পাক খেতে থাকবে।
প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধু ইউজিসির সমস্যা নয় স্বয়ং আমলাতন্ত্রও এই সমস্যায় জর্জরিত; এটি সরকারি কাজের ধীরগতি, অতিরিক্ত নিয়মকানুন এবং ফাইল অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে উদ্ভূত। রাফিকের মতো গবেষকদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ থমকে পড়ে, এবং শিক্ষার্থীরা নতুন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। প্রকল্প, কোর্স, এবং গবেষণার অনুমোদনের অপেক্ষায় বছর ঘুরে যায়, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যায় না।
এখন প্রশ্ন হলো যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেহুদা খবরদারি চালায়, ইউজিসি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, এবং ইউজিসিকে শুধু ‘উচ্চ শিক্ষা কমিশন’ নাম দিয়ে স্থানান্তর করা হয় কিন্তু মূল ব্যবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে শিক্ষার মান কে রক্ষা করবে? দেশের শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত কি এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে হারিয়ে যাবে, নাকি আমরা এমন কোনো সংস্কার আনব, যা শিক্ষার পথে বাধাগুলো দূর করবে?
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সমস্যার মূলেই রয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, প্রয়োজনীয় তহবিল দিতে দেরি হয়, এবং শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগগুলো স্থবির হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানের উদ্ভাবনী গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স, এবং দক্ষ শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি সবই এই ব্যর্থ ব্যবস্থার শিকার হচ্ছে।
রাফিকের প্রকল্প যদি শুরু হত এবং নাজমার কোর্স সময়মতো চালু হত, দেশের শিক্ষার মান কি এতটা পিছিয়ে থাকত? উচ্চশিক্ষার মান বজায় রাখার জন্য কি আমাদের শুধু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, নাকি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, পর্যাপ্ত তহবিল, স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও উদ্ভাবনশীল সংস্কারও অপরিহার্য?
বাংলাদেশের শিক্ষার ভবিষ্যত এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নিহিত। আমাদের ভাবতে হবে একটি দেশ কি শিক্ষার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে, যদি নিয়ন্ত্রণ ও খবরদারি ব্যবস্থা শিক্ষার প্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে? আর যদি না পারে, তাহলে আমাদের কি সেই অন্তরায় দূর করার জন্য ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব নেই?
উচ্চশিক্ষার মান শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ। আজকের গবেষণা বিলম্বিত হলে, আগামীকাল দেশের উদ্ভাবনীর গতিও বিলম্বিত হবে। আজকের স্বায়ত্তশাসন ও নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব যদি সমাধান না হয়, তবে শিক্ষার মানের পতন অচিরেই দেশের ভবিষ্যতের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
ড. মোর্ত্তুজা আহমেদ: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- উচ্চশিক্ষা
- আমলাতন্ত্র
- ইউজিসি
