ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

কুষ্টিয়ায় মব সহিংসতা দেশের অংশনিসংকেত 

কুষ্টিয়ায় মব সহিংসতা দেশের অংশনিসংকেত 
×

কুষ্টিয়ার এই ঘটনা কেবল হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়; এটি সতর্কবার্তা

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির 

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৩১ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৩৫

গুজব, আবেগ আর দায়মুক্তির সংস্কৃতি কীভাবে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে, কুষ্টিয়ার ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ।  কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়– এটি আমাদের সময়ের এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। 
একজন মানুষকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো; কিন্তু সেই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলো না। আইন, বিচার ব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো স্তরকে সুযোগ না দিয়েই একটি গোষ্ঠী নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত সেই ‘বিচার’ পরিণত হলো নির্মম প্রহারে, কুপিয়ে হত্যা এবং একটি আস্তানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়। 
এই দৃশ্য কেবল ভয়াবহ নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ভেতরে জমে ওঠা এক অস্থির বাস্তবতার প্রকাশ। কারণ এখানে যে সহিংসতা আমরা দেখি, তা আকস্মিক নয়; বরং ধাপে ধাপে তৈরি হওয়া একটি সামাজিক প্রক্রিয়ার ফল। 
অতীতের মতো এখানেও প্রথমে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। সেটিকে বিশেষভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যাতে তা মানুষের ধর্মীয় আবেগকে নাড়া দেয়। এরপর সেই আবেগ ক্ষোভে রূপ নেয় আর ক্ষোভ সংগঠিত হয়ে দাঁড়ায় অনেকের  ক্রোধে। সেই ক্রোধ যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে, তখনই জন্ম নেয় ‘মব’।  
এখানে প্রশ্ন ওঠে– এই ‘মব’ কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি এটি তৈরি করা হয়? বাস্তবতা বলছে, এই ধরনের সহিংসতা খুব কম ক্ষেত্রেই হঠাৎ ঘটে। বরং এটি একটি সংগঠিত সামাজিক ও মানসিক প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে ডিজিটাল উস্কানি, স্থানীয় প্রভাব এবং নানা অসহিষ্ণুতা একত্রে কাজ করে।
এই প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নটি সামনে আসে। ধর্ম মানুষের জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত একটি অনুভূতি; কিন্তু সেই অনুভূতিকে যদি আইনের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো হয়, তাহলে তা ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। কারণ তখন যুক্তি, প্রমাণ ও বিচার প্রক্রিয়া অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে এবং প্রাধান্য পায় আবেগ, আর আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই সহিংসতায় রূপ নেয়।  
বাংলাদেশ একটি সংবিধানিক রাষ্ট্র, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত। কিন্তু যখন জনতা নিজেরাই বিচারক হয়ে ওঠে, তখন সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। 
কুষ্টিয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকাও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল; কিন্তু তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। এই ‘উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত’ থাকা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি গুরুতর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে। 
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি। এই বিলম্ব কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি একটি সামাজিক বার্তা বহন করে। সেই বার্তাটি হলো, এ ধরনের সহিংসতার পরও পার পাওয়া সম্ভব। 
এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই মব সহিংসতার সবচেয়ে বড় প্রণোদনা। যখন মানুষ দেখে, পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর বিচার হয়নি বা বিলম্বিত হয়েছে, তখন তারা নতুন করে সহিংসতায় জড়াতে ভয় পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও নতুন করে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ কুষ্টিয়ার মতো সাম্প্রতিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়; বরং এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে সাম্প্রতিক অতীতের উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার মধ্যে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে আমরা একের পর এক এমন সহিংস ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, যা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নির্দেশ করেনি, বরং সমাজের ভেতরে সহিংসতার এক নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি করেছিল। বিভিন্ন স্থানে সুফি সাধক, মাজার ও ধর্মীয় আস্তানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটেছে– যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রতীক। 
এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না; বরং একটি বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ ছিল, যেখানে সংগঠিত জনতা আইনকে অগ্রাহ্য করে নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সে সময় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এ ধরনের সহিংসতার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ছিল, কিছু ক্ষেত্রে এই সহিংসতাকে ‘মব সন্ত্রাস’ হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না করে একে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে বর্ণনা করা। যখন মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে, বিচারবহির্ভূতভাবে শাস্তি দিচ্ছে, তখন এই ধরনের ভাষা ব্যবহার বাস্তবতাকে আড়াল করার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। 
রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল মহল থেকে এ ধরনের বক্তব্য ছিল নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত এবং গভীরভাবে হতাশাজনক। কারণ নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা যেখানে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, সেখানে এই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে পরিস্থিতিকে ভাষাগতভাবে প্রশমিত করার চেষ্টা কার্যত সমস্যাটিকে আরও গভীর করেছে।
ফলত, সেই সময়ের দায়মুক্তি ও নীতিগত দুর্বলতার ধারাবাহিকতাই আজকের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হচ্ছে বলে মনে হয়। যখন একটি সমাজে সহিংসতার পরও দৃশ্যমান বিচার হয় না, বরং তা নানা ব্যাখ্যার আড়ালে আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন ভবিষ্যতে আরও বড় ও নির্মম ঘটনার পথ প্রশস্ত হয়। কুষ্টিয়ার ঘটনাটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি উদ্বেগজনক প্রতিফলন।
একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অনস্বীকার্য। একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন কেবল তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে প্রভাব বিস্তারের শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনি গুজবও ছড়ায় আরও দ্রুত– আর সেই গুজব যখন আবেগকে উস্কে দেয়, তখন তা বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিতে সময় লাগে না। 
সবশেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়, আমরা কোন সমাজের দিকে এগোচ্ছি? এমন একটি সমাজ, যেখানে অভিযোগ উঠলেই দলবদ্ধ গোষ্ঠী  রায় দিয়ে দেবে? যেখানে আদালত, প্রমাণ, বিচারপ্রক্রিয়া– সবকিছুই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে? 
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। মানুষের মধ্যে ভীতি বাড়বে, ভিন্নমত প্রকাশের সাহস কমে যাবে, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরও অনিরাপদ হয়ে পড়বে। আর সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনা তাই কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়; এটি আমাদের সামনে একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয়– আইনের শাসন দুর্বল হলে, সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় উন্মত্ত জনতা। আর যেখানে উন্মত্ত জনতা বিচারক হয়ে ওঠে, সেখানে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার নয়, ভয়ই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী 

আরও পড়ুন

×