ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

ভয়ের সংস্কৃতি ও সবার নির্বিকারত্ব

ভয়ের সংস্কৃতি ও সবার নির্বিকারত্ব
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের স্বৈরশাসন ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসের দুর্বল অপশাসনে সমাজে বড় আকারে অসহিষ্ণুতা শিকড় গেড়ে বসেছে। মত, ধর্ম, আচার, লিঙ্গ বা চিন্তা– ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পার্থক্য থাকবে; এটাই স্বাভাবিক ও সংগত। এই স্বাভাবিক সত্য অগ্রাহ্য করে আপন মত ও পছন্দকে অন্যের ওপর চাপিয়ে তা মানতে বাধ্য করবার চেষ্টায় আক্রমণ করবার অহরহ ঘটনা নিয়মিত দেখেছি আমরা। ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে গণতন্ত্রের নবযাত্রার মধ্য দিয়ে অন্তত মব সন্ত্রাসের কালো অধ্যায়ের অবসান হবে– এ ছিল দেশের মানুষের ন্যূনতম প্রত্যাশা। বিজয়ী বিএনপির পক্ষ থেকেও বারংবার আশ্বস্ত করে বলা হয়েছে– এ দেশে মব সন্ত্রাসের দিন শেষ!

কিন্তু সম্প্রতি শাহবাগ ও কুষ্টিয়ায় মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার শাহবাগে ট্রান্স জেন্ডারদের ওপর মব হামলার সময় পুলিশ দর্শক হিসেবে ঘটনাটি দেখে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শনিবার দুপুরে সংঘবদ্ধ ‘তৌহিদি জনতা’ মব হামলা চালিয়ে দরবারে আগুন দেয় ও পীর আবদুর রহমান শামীমকে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার আগের রাতে পুরোনো একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয়ে মব সন্ত্রাসে অংশগ্রহণকারীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বারংবার আবির্ভূত হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘তৌহিদি জনতা’ নূরুল হক ওরফে নূরাল পাগলার দরবার ও কবরে ভাঙচুর করে। তারা নূরালের মরদেহ কবর থেকে তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার এই বীভৎস সহিংসতার সময় যেমন নির্বিকার ছিল, তেমনি গত বছর ডিসেম্বরে গণমাধ্যম, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা এবং বিভিন্ন সময়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরসহ দেশের আনাচে কানাচে একের পর এক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে মব সন্ত্রাস চলার সময়ও অনুরূপ ভূমিকা পালন করে। 

সাম্প্রতিক শাহবাগ ও কুষ্টিয়া, এ দুটি হামলার ঘটনা অবশ্যই পরিকল্পিত। বর্তমান সরকার এগুলোর দায় এড়াতে পারে না। শাহবাগের ঘটনায় নিষ্ক্রিয় পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? নাকি তাদের প্রতি কোনো নির্দেশনাই নেই! এ-ও বড় অদ্ভুত যে, প্রতিটি ঘটনায় পৃথক নির্দেশনার জন্য যদি অপেক্ষা করেন পুলিশ সদস্যরা, তাহলে সন্ত্রাস দমন আদৌ সম্ভব হবে না। ডিম আগে, না মুরগি আগে– তর্ক দূরে রেখে যার কাজ তাকে অবশ্যই করতে হবে। সকল সরকারের আমলেই দেখি, চার-পাঁচজন মানুষ মিছিল করবার উদ্যোগ নিলে নানা ধরনের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মী এগিয়ে আসেন; প্রশ্ন করেন, মিছিলের উদ্দেশ্য কী? আপনারা কারা? অথচ শাহবাগে ট্রান্স জেন্ডারদের ওপর হামলায় পুলিশ নিস্পৃহ থাকে! কুষ্টিয়াতেও একই ধরনের পুলিশি নিস্পৃহতা দেখা গেছে। রাতভর পীর আবদুর রহমান শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার প্রচারণা চালানো হলো ফেসবুকে। পুলিশের নজরেও তা আসে। দু-চারজন পুলিশ পাঠানোও হয় দরবারে। কিন্তু মব সন্ত্রাস রুখে দেওয়ার জন্য তা মোটেও যথেষ্ট ছিল না।
মব সন্ত্রাস চিহ্নিত গোষ্ঠীর কাজ। এরাই মাজার ভাঙে, বাউলদের ওপর হামলা করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংঘটিত হামলার তালিকা করে হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনলে মব সন্ত্রাসীরা এত আশকারা পেত না। বর্তমান সরকারের উচিত অবিলম্বে এ পদক্ষেপ নেওয়া।  

০২.
জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অপরাধ ও অনৈতিক কার্যক্রম সম্পর্কে জবাবদিহি চাওয়ার কোনো উদ্যোগ অবশ্য নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে ২৯ দিনে হামে মারা গেছে ২৮ শিশু। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৫১ শিশুর (সমকাল, ১৩ এপ্রিল)। অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে শিশুদের টিকা না দেওয়ায় নিরাময়যোগ্য রোগ হামে শিশুমৃত্যুর মিছিলের জবাব দেওয়ার জন্য কাউকে দেখা যাচ্ছে না। জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রশ্নে সংসদে সরকারকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবার চেষ্টা করছে বিরোধী দল। কিন্তু প্রায় মহামারিতে পরিণত হওয়া হাম তাদের আলোচনার বিষয় হয় না। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের নানা রকম দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপারেও সরকার ও বিরোধী পক্ষের নীরবতা রাষ্ট্রযন্ত্রে জবাবদিহিহীনতাকেই স্পষ্ট করে। 

প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় বাসভবন গণভবনকে জুলাই জাদুঘর বানানোর অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। রাজধানীর হৃৎপিণ্ডে ১০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত গণভবন দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মারকের জন্য হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বরাদ্দ করলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের জন্য কত কোটি টাকা বরাদ্দ করা প্রয়োজন? না, অন্তর্বর্তী সরকার সে চিন্তা করেনি। তারা মব সন্ত্রাসে ভাঙচুরের শিকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘর সংস্কার করবারও প্রয়োজন মনে করেনি। অর্থাৎ রাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক আর প্রয়োজনীয় নয়! জাতীয় জাদুঘরের একটি অংশে জুলাই জাদুঘর স্থাপন করে গণভবনকে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগার হিসেবে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। সেটিই যুক্তিসংগত ও প্রাসঙ্গিক। 

০৩.
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘একাত্তরে বিএনপির জন্ম হয়নি, একাত্তর তাদের হয় কীভাবে?’ জন্ম না হলেই চেতনা বা প্রত্যয় ধারণ করা যায় না? ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বিএনপির সুস্পষ্ট অবস্থান জাতিকে আশান্বিত করে। তখন দলের নেতা তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘এ দেশে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী বা সংশয়ী সকলে সমান মর্যাদা ও সম্মানে বাস করবেন।’
কিন্তু শাহবাগ ও কুষ্টিয়ার ঘটনা দেশে সব মত-ধর্ম-লিঙ্গের মানুষের সমান অধিকার ও সম্মানপ্রাপ্তির পক্ষে বলে না। ভয়ের যে সংস্কৃতি গত দেড় দশকের বেশি সময়ে এ দেশে গড়ে উঠেছে; চলমান সংসদে সে ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের নির্বিকারত্বের ঐক্যই বরং আমরা দেখছি। গত ২০ মাসের সবচেয়ে আলোচিত মব সন্ত্রাস নিয়ে সংসদে বিন্দুমাত্র আলোচনা হয়নি। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করে মানুষের জীবন ও মতের সম্মান অটুট রাখায় প্রত্যয়ী সংসদই আসলে গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনের পথ প্রশস্ত করে। জাতীয় সংসদকে সেই পথে প্রত্যয়ী হতে দেখতে চাই।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×