ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

দেশের স্বাস্থ্যখাতে যুদ্ধের প্রভাব

দেশের স্বাস্থ্যখাতে যুদ্ধের প্রভাব
×

পরিবহন ও সরবরাহ খরচ বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের সম্ভাব্য ঘাটতির কারণে ঔষধ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে

গোলাম শওকত হোসেন 

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৫২ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৬

চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাত বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করছে, যার প্রধান কারণ হলো সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকট। হরমুজ প্রণালীর কাছে সংঘটিত হামলাসহ এই সংঘাতটি সক্রিয় ঔষধীয় উপাদান আমদানিতে বিঘ্ন ঘটাতে এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।  
বাংলাদেশ ঔষধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্রিয় ঔষধীয় উপাদানের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এই যুদ্ধ  ইতোমধ্যে নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যার ফলে মাল পরিবহনের খরচ   বেড়েছে এবং এই অপরিহার্য কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে। 

পরিবহন ও সরবরাহ খরচ বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের সম্ভাব্য ঘাটতির কারণে ঔষধ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। প্যারাসিটামল ও মেটফর্মিনের মতো ওষুধের প্রধান কাঁচামালের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে, যা ভোক্তাদের জন্য  ঔষধ উল্লেখযোগ্যভাবে আরও ব্যয়বহুল করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। 
বাংলাদেশ বিদ্যুতের জন্য আমদানিকৃত এলএনজির উপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে তেল ও এলএনজির দামে তীব্র বৃদ্ধি ঘটতে পারে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রভাবিত করবে। এই বিদ্যুৎ হাসপাতাল এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোর উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য অপরিহার্য।
বর্ধিত চিকিৎসা ব্যয় এবং জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের   পরিবারগুলোর মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।  

এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ, যেখানে বহু বাংলাদেশী কাজ করেন। পরিবারের আয়ের অন্যতম  প্রধান উৎস রেমিটেন্সের প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটলে, তা পরিবারগুলোর চিকিৎসা খরচ বহনের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করতে পারে, কারণ অনেকেই স্বাস্থ্যসেবার খরচ মেটানোর জন্য এই অর্থের উপর নির্ভরশীল। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি সরাসরি যুদ্ধ বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেবে, চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহে বড়  ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা   বাড়িয়ে তুলছে এবং ব্যাপক শরণার্থী  প্রবাহের কারণ হবে। এটি এই অঞ্চলে বিশ্ব  স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত  জ্বালানি ও অবকাঠামোর কারণে রোগের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্যের  উপর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের ভবিষ্যৎ প্রভাবের দৃষ্টিকোণ-   
ইরানি এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোর উপর হামলা হাসপাতাল, বিশুদ্ধ পানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি করে এবং রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি সারা বিশ্বে রিপেল এফেক্টে প্রভাব ফেলবে। 
এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে ব্যাপক স্থানচ্যুতির কারণ হবে, যা আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে এবং ব্যাপক জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের প্রয়োজন হবে, তার চাপ বাংলাদেশেও আসবে। 

যুদ্ধের ফলে তেল ও গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম বিশ্বজুড়ে হাসপাতালগুলোর পরিচালন ব্যয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের খরচ বাড়িয়ে দিবে। 
এই সংঘাত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য উদ্যোগ সমন্বয়ের ক্ষমতাকে জটিল করে তুলছে, কারণ আঞ্চলিক নিরাপত্তা অবনতি হয এবং মনোযোগ সংঘাত থেকে টিকে থাকার দিকে সরে যায়। থিঙ্ক গ্লোবাল হেলথ, ডেভেক্স এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক নিবন্ধ অনুসারে, ইরান যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবেই  নয়, বরং একটি ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবেও আবির্ভূত হচ্ছে। এর প্রাথমিক সতর্ক সংকেতগুলো ঔষধ সরবরাহ শৃঙ্খল, মানবিক সহায়তা প্রাপ্তি,  খাদ্য ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন এবং ভঙ্গুর দেশগুলোতে পরিষেবা প্রদানের  ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতের সবচেয়ে স্পষ্ট উদ্বেগগুলোর মধ্যে একটি হলো ঔষধ সরবরাহ  ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটা। জেট-ফুয়েলের দাম বাড়ার ফলে আকাশপথগুলোতে চাপ  থাকাবে ও ফ্রেইট চার্জ বেশি হবে ও  ঔষধের দাম বাড়বে।

জরুরি চালান এবং তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য যেমন ভ্যাকসিন, ইনসুলিন, বায়োলজিকস এবং  ক্যান্সার থেরাপির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে,  নিরাপত্তাহীনতা, আকাশপথ বন্ধ থাকা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার কারণে যুদ্ধের ফলে তাদের দুবাইয়ের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি  সরবরাহ কেন্দ্রটি স্থগিত হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, এই বিঘ্নের কারণে ১৮ মিলিয়ন   ডলার মূল্যের মানবিক স্বাস্থ্য সামগ্রী পৌঁছানো যাচ্ছে না, আরও ৮ মিলিয়ন ডলার  মূল্যের চালান আটকে আছে এবং ২৫টি দেশের ৫০টিরও বেশি জরুরি সরবরাহের অনুরোধ প্রভাবিত হচ্ছে, যার মধ্যে পোলিও পরীক্ষাগারের সরঞ্জামও রয়েছে। বিশ্ব  স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এখন জাতিসংঘের অন্যান্য কেন্দ্র এবং স্থলপথের মাধ্যমে বিকল্প পথ খুঁজছে। যুদ্ধটি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে আরও সরাসরিভাবে হুমকির মুখে ফেলছে, কারণ এটি নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা এবং   মানবিক পরিষেবা পাওয়ার সুযোগকে ব্যাহত করছে। হিলিয়াম প্ল্যান্টে আগাতের ফলে এম-আর-আই মেশিন দ্বারা পরিক্ষা ব্যাহত হবে।  

গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হবে ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ফসলের ফলনকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। এই ধাক্কায় অবহেলিত রোগ গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ইতিমধ্যেই ভঙ্গুর তহবিলকেও  সংকুচিত করা হচ্ছে, যা নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের  অগ্রগতিকে মন্থর করে দেবে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও অল্প কিছু পরিবহন করিডোর, সাহায্য চ্যানেল এবং জরুরি সরবরাহ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। সার্বিক উপলব্ধি হলো যে, ইরান যুদ্ধকে কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের পরীক্ষা হিসেবে বোঝা উচিত। আমাদের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলোর স্বাস্থ্যখাতে সংকট আরও বাড়বে।
ডা. গোলাম শওকত হোসেন: চিকিৎসক, গবেষক ও লেখক   
 

আরও পড়ুন

×