আন্তর্জাতিক
যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার অজুহাত খুঁজছেন ট্রাম্প
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
সাজ্জাদ সিদ্দিকী
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন দ্বিতীয় দফার আলোচনার আয়োজন চলছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বার্তা নিয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনীর তেহরান গিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি নিজেই পাকিস্তান সফর করবেন। উভয়পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ‘খুব কাছাকাছি’ পর্যায়ে আছে। অন্যদিকে আলজাজিরার খবর অনুসারে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও, চুক্তি মানার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রচণ্ড অবিশ্বাস সত্ত্বেও, আলোচনার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, প্রথম দফার আলোচনায় ইরান চলমান যুদ্ধবিরতি লেবাননেও প্রযোজ্য বলে দাবি করেছিল। তখন মার্কিন প্রতিনিধি দল তা অস্বীকার করে বিষয়টি ইসরায়েলের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। তবে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে। এ যুদ্ধবিরতিকে ইরানের সঙ্গে সংঘাত অবসানে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনেকের ধারণা, শান্তিচুক্তি হলেই হয়তো শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, শান্তি তার গন্তব্যে পৌঁছে যাবে। বাস্তবে শান্তির কোনো গন্তব্য নেই, শান্তি একটি চলমান প্রক্রিয়া। হয়তো এর আপেক্ষিকতার ওপর নির্ভর করে যে কোন ধরনের শান্তি (ইতিবাচক, নেতিবাচক) কখন বিরাজ করছে বা করবে।
এই আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করার আগে কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণে রাখা প্রয়োজন। ১৯০০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় দুই হাজার শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে ধরলে এই সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও শান্তিবিশারদদের গবেষণা বলছে, স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির প্রায় ৫০ শতাংশই প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে অকার্যকর হয়ে পড়ে। অর্থাৎ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের হার বেশ হতাশাজনক।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি কিংবা শান্তি আলোচনার প্রেক্ষাপটটি কেন তৈরি হলো? এর জন্য প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ময়নাতদন্ত, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিত্র দেশগুলোর অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত এবং নিয়ন্ত্রিত ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের অবস্থান, সর্বোপরি কেন আসিম মুনির এবং শাহবাজ শরিফ এই শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী।
আসিম মুনির ইতোমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বিশেষ বা ‘ট্রাস্ট ওয়ার্থি’ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, তা সবারই জানা। একই সঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কয়েক মাস আগে যেভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে পোডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে তোষামোদ করছিলেন, তাও স্মরণ করা যেতে পারে। এটাও মনে রাখতে হবে, যখন কোনো শক্তিশালী দেশ যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজের দুর্বলতা বুঝতে পারে, তখন বড় বড় হুঙ্কারের মধ্যেই তারা ‘সম্মান’ বজায় রেখে পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বর্তমানে অস্থিরতা চলছে, বিশেষ করে তেলের দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করছে; লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। এটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ; যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি তারা মেনে নিতে রাজি নয়। আগামী নভেম্বরে সেখানে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের মধ্যবর্তী নির্বাচন, যার মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে সক্ষম ওই দুই প্রতিষ্ঠানের দখল বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে চলে যেতে পারে। সব মিলিয়ে যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার জন্য ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টি একটি ‘এক্সকিউজ’ বা অজুহাত খুঁজছে।

প্রথম দফার আলোচনায় বসার ঠিক আগমুহূর্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ অবিশ্বাস রেখেই এই শান্তি আলোচনায় বসছি।’ এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় যে ইরান তাদের অবস্থানে অনড়। কয়েক দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিভিন্ন দেশে আটকে রাখার পরেও তাদের এই শক্ত মনোবল অটুট। এটা প্রমাণ করে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধ থেকে একটি ইতিবাচক ফল বের করে আনতে ইরান মরিয়া।
ইরানের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি সমর্থন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষে এখন আগের মতো জোরালো নয়; ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্বের পূর্ণ সমর্থনও মিলছে না। রিপাবলিকান দলের ভেতরে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে ইসরায়েলের অর্থনীতিও এখন নাজুক।
বিপরীতে এমন যুক্তি উঠতেই পারে যে ইরানের অবস্থাও নড়বড়ে। তবে এই দুই সংকটের তুলনা সঠিক হবে না। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময় থেকেই ইরান অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রামে অভ্যস্ত। বলতেই হবে, বিশ্ব রাজনীতি এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। বুধবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন: ‘আমি স্থায়ীভাবে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দিচ্ছি...। ইরানে অস্ত্র না পাঠানোর বিষয়ে চীন রাজি হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পর আমি যখন সেখানে যাব, প্রেসিডেন্ট শি আমাকে একটি উষ্ণ আলিঙ্গন দেবেন। আমরা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে এবং চমৎকারভাবে একসঙ্গে কাজ করছি! এটি কি লড়াই করার চেয়ে ভালো নয়? তবে মনে রাখবেন, যদি প্রয়োজন হয়, আমরা লড়াই করতেও অত্যন্ত দক্ষ–অন্য যে কারও চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ!!!’ যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে অস্ত্র পাঠানোর অভিযোগ চীন নাকচ করে দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই ধরনের অবস্থান স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের দামামা কমিয়ে একটি কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে পরাজয়ের গ্লানি মোছার শেষ চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় ইরানের পক্ষে কেবল প্রতিরোধ অব্যাহত রাখাই হবে দিন শেষে দেশটির কৌশলগত বিজয় এবং সেই সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য নিশ্চিতকরণ।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- সাজ্জাদ সিদ্দিকী
