অন্যদৃষ্টি
শিক্ষকদের সততা ও সাহস
এ এইচ এম জেহাদুল করিম
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:০৪
১৯৮৭ সালের শেষার্ধে আমি আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যথারীতি নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পূর্বের চাকরিতে যোগদান করি। দেশে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি ভারতের হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য আমন্ত্রিত হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এমন একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যাওয়ার জন্য প্রথা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অনুদান ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। বেদনাদায়ক, তথাপি এতেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হতো। আমার জানামতে, সম্ভবত বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোনো দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য এ ধরনের অবমাননাকর আর্থিক বরাদ্দ আর কোথাও নেই।
পক্ষান্তরে আমার মনে আছে আমি যখন মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছি; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ আর্থিক অনুদানে আমি ম্যানচেস্টার, অকল্যান্ড, টোকিও, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগদান করেছি। যার সার্বিক খরচ আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রদান করেছে।
এ ছাড়া সেসব দেশে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপগুলো মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্যই বেশির ভাগ নির্ধারিত থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে বিদেশ থেকে আগত স্কলারশিপ আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করে মন্ত্রণালয়ের আমলারা করায়ত্ত করে বিদেশ ভ্রমণের সার্টিফিকেট অর্জন করেন, যা দুঃখজনক। ফলে আমাদের দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার ধীরে ধীরে অবনয়ন ঘটেছে। বিশেষ করে বিগত কয়েক দশকে সরকারি পর্যায়ে লজ্জাহীন তোষণনীতির কারণে এই বিষয়গুলো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, যা আমার মতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে অত্যন্ত নিম্নাভিমুখী করছে।
যা হোক, ভারতের হায়দরাবাদে কনফারেন্সে যাবার জন্য আমি যথারীতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ডিন প্রফেসর এফ.আর. খান স্যারের সুপারিশসহ সেমিনারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার প্রাপ্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদানের জন্য উপাচার্য ড. রকীব আহমেদের কাছে আবেদন করি।
স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ ও জ্ঞানী শিক্ষক এবং ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সোজাসাপ্টা কথা বলেন। আমার অনুদানের ফাইলটি যখন উপাচার্যের টেবিলে গেল তিনি সেটি নামঞ্জুর করার সিদ্ধান্ত নিতে চাইছিলেন এবং আমাকে ডেকে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেন, আপনি তো সবেমাত্র আমেরিকা থেকে ফেরত এসেছেন। আমার মনে হয়, আপনি নিজ অর্থেই সেমিনারে চলে যেতে পারেন।
আমি বললাম, স্যার এসব আন্তর্জাতিক সেমিনারে যেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নিজ অর্থও খরচ হয়। তবে এটি অনস্বীকার্য, অনুদানের এই যৎকিঞ্চিৎ অর্থ মূলত আমাদের একটি অনুপ্রেরণা। সচ্ছলতার প্রসঙ্গ এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আইনত এটি আমি দাবি করতেই পারি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুসারে এই অর্থ আমার প্রাপ্য। তবে অনুমোদনের ক্ষমতা সম্পূর্ণ আপনার।
এই বলে আমি সবিনয়ে উপাচার্যকে সালাম জানিয়ে তাঁর কক্ষ ত্যাগ করি। আমি চলে আসার কিছুক্ষণ পরই তিনি তাঁর সেক্রেটারিকে দিয়ে আমাকে ফের ডেকে পাঠান এবং অনুদানের অর্থটি মঞ্জুর করেন। তিনি বললেন, ‘আপনার বক্তব্য আমার কাছে অত্যন্ত যৌক্তিক মনে হয়েছে। তাই এটি আমি অনুমোদন দিয়েছি।’
আমি যথারীতি ভারতীয় ভিসা সংগ্রহ করে হায়দরাবাদ রওনা করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কলকাতা থেকে হায়দরাবাদ যাওয়ার ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করতে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হই। অগত্যা পরদিনই আমাকে কলকাতা থেকে দেশে ফেরত আসতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক রীতি অনুসারে অনুদানের অর্থ অফেরতযোগ্য। কিন্তু আমি পাঁচ হাজার টাকা থেকে ১৮০০ টাকার ভাউচার প্রদান করে বাকি টাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে ফেরত দিই। অ্যাকাউন্টস সেকশনে কর্মরত অভিজ্ঞ অ্যাকাউন্টস অফিসার সাইদ সাহেব আমাকে বলেন, ‘অনুদানের অর্থ ফেরত দেবার নজির বিশ্ববিদ্যালয়ে এটিই প্রথম’। আমার সেই কনফারেন্স পেপার পরে হংকংয়ের একটি নামি জার্নালে প্রকাশিত হয়।
ড. এ এইচ এম জেহাদুল করিম: প্রাক্তন উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়; অ্যাজাঙ্কট প্রফেসর, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
- বিষয় :
- পিএইচডি
- অন্যদৃষ্টি
