সামাজিক সুরক্ষা
সরকারি কার্ড ও ভাতা কর্মসূচিতে জবাবদিহি
বদরুল হাসান
বদরুল হাসান
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:১১
ক্ষমতাসীন দল তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দ্রুত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষায়িত কর্মসূচি ‘খাল কাটা’র পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘ধর্মীয় নেতা ভাতা’– এ দুটি পাইলট কর্মসূচি চালু করেছেন। ‘ফার্মার্স কার্ড’ বা কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে পাইলট কর্মসূচিগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তুতির দাবি করা হয়েছে। সম্ভাব্য ভাতা ও সেবা গ্রহীতার তালিকা ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণে প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত প্রাপকদের কাছে সুবিধাগুলো সঠিকভাবে পৌঁছায়।
যখন নতুন কোনো কল্যাণমূলক ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়; প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা জিআরএস কতটা কার্যকর, তার ওপর। বৃহৎ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ভুল শনাক্তকরণ, প্রশাসনিক বিলম্ব বা তালিকা প্রণয়নে বিভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এমন পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা না থাকলে এসক জনবান্ধব উদ্যোগ সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে পাইলট প্রকল্প– ফ্যামিলি কার্ড, ধর্মীয় নেতা ভাতা এবং ফার্মার্স কার্ড যথাক্রমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বৃহৎ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তদের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। যেমন যোগ্যতার মানদণ্ড, অর্থ প্রদানের সময়সূচি, নিবন্ধন পদ্ধতি, তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার কারণ কিংবা যথাযথ পরিমাণ অর্থ না পাওয়া ইত্যাদি নিয়ে সুবিধাভোগীদের মধ্যে এমনিতেই নানা আলোচনা চলতে থাকে। যেহেতু দেশে ডিজিটাল বিভাজন এখন বিদ্যমান, তাই সবার কাছে সব তথ্য একইভাবে নাও পৌঁছাতে পারে। এসব কর্মসূচিতে ডিজিটাল কার্ড দেওয়া হচ্ছে ঠিকই, তবে কার্ড থাকলেই সংশ্লিষ্ট সবাই পুরো ব্যবস্থাটি বুঝে ফেলবে– এমনটি ভাবা ঠিক নয়।
কোথায় সহায়তা পাওয়া যাবে, কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে এবং সেই অভিযোগ কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে– সে জন্য একটি সক্রিয় ও সহজে ব্যবহারযোগ্য অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা জিআরএস থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ জানানোর একাধিক চ্যানেল যদি সহজলভ্য ও কার্যকর না থাকে, তবে সাধারণ মানুষ বিশেষত কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হন।
তাদের অনেক সময় মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে তথ্য বিভ্রাটের শিকার হওয়া বিচিত্র নয়। দেশব্যাপী বৃহৎ কর্মসূচির ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা দ্বৈত ভূমিকা পালন করে। একদিকে এটি অভিযোগ গ্রহণ ও সমাধানে ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে কর্মসূচির কাঠামোগত ত্রুটি শনাক্ত ও সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণে নীতিনির্ধারকদের সাহায্য করে।
সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদের আলোকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে সরকার ‘জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল’ (এনএসএসএস) প্রণয়ন করেছে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের সুরক্ষায় গৃহীত এই কৌশলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারও উদ্যোগী।
এই কৌশলপত্রে অভিযোগের প্রতিকার ব্যবস্থা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। এতে মন্ত্রণালয়গুলোকে অভিযোগ নথিভুক্ত করা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে পরিচালিত কেন্দ্রীয় জিআরএস সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য সরকারি সেবা সম্পর্কে অভিযোগ জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক পথ তৈরি করেছে। তবে বর্তমান ব্যবস্থাটি মূলত প্রশাসনিক অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। জিআরএস ব্যবস্থার প্রচার ও প্রসারে তেমন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যায় না। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তৃতির পাশাপাশি অভিযোগ ব্যবস্থাকেও উন্নত করা প্রয়োজন, যাতে উপকারভোগীদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং অভিযোগ দায়ের ও তদন্তের প্রক্রিয়াটি সহজ ও সুনির্দিষ্ট হয়।
নতুন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সরকার এ বিষয়ে কয়েকটি পরামর্শ বিবেচনা করতে পারে।
কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠীকে খুদে বার্তা (এসএমএস), স্থানীয় নোটিশ বোর্ড বা ইউনিয়ন পরিষদ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্তরের অফিস, বেসরকারি গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে তাদের অধিকার ও অভিযোগ করার পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারের অনেক টোল-ফ্রি তথা বিনামূল্যের হটলাইন রয়েছে। এসব হটলাইনে এই সুরক্ষা কর্মসূচির তথ্য আদান-প্রদান ও অভিযোগ দাখিলের ব্যবস্থা যুক্ত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোয় বিদ্যমান জিআরএস ব্যবস্থার সঙ্গে এসব কর্মসূচির নিবিড় সমন্বয় জরুরি। কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ জানানোর পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে দ্রুত তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী প্রকল্পে যোগ্যতা নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠান নির্বাচন নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী অভিযোগ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন। পঞ্চমত, কৃষি খাতের ‘স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট’ (এসএসিপি)-এর মতো পাঁচ স্তরবিশিষ্ট অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি স্তরে নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করবেন, যা স্বচ্ছতা ও দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করবে। ষষ্ঠত, প্রক্রিয়টি কেবল তথ্য জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা পর্যাপ্ত নয়। বরং সেবা গ্রহীতারা যেন অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত হন এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা দূর করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নানা ব্যবস্থা সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। সপ্তমত, আমাদের দেশে এ ধরনের সাড়া প্রদান ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে সেবা প্রদানকারী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আয়োজন করাও অপরিহার্য।
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতি বিশেষজ্ঞ
[email protected]
- বিষয় :
- ক্ষমতা
